যার পাকা বিশ্বাস ….. কিসের?-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যার পাকা বিশ্বাস নেই, তার অনুভূতি নেই ; আর, যার অনুভূতি নেই, সে আবার পণ্ডিত কিসের?

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দর্শনের আগেও অনুভূতি আছে, পরেও অনুভূতি আছে। অনুভূতিরও শেষ নেই, দর্শনেরও শেষ নেই। একটা খুঁটি সম্বন্ধে আমার অনুভূতি আছে, গিয়ে দেখলাম খুঁটিই। মানুষ সম্বন্ধে একটা বোধ আছে, পরে দেখলাম এটা একটা কলাগাছ, মানুষ নয়। যা’ মোটেই দেখনি, শোননি, তাকে চিনবে কেমন ক’রে, বিশ্বাসই বা হবে কিসে?

দস্যু রত্নাকরের কথা উঠল।

জনৈক দাদা—আমরা জানি দেবর্ষি নারদের সঙ্গে রত্নাকরের সাক্ষাতের ফলেই রত্নাকর পরবর্তীকালে মহামুনি বাল্মীকি হলেন। দস্যু রত্নাকরের সৎ-ভাবের অনুভূতি ছিল না, কিন্তু ঋষির দর্শনে তাঁর সঙ্গ পেয়ে জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ হ’ল, প্রকৃত বোধ জাগল। এক্ষেত্রে তো বোঝা যাচ্ছে আগে দর্শন বা সঙ্গলাভ, পরে বোধশক্তি বা অনুভূতির প্রকাশ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—রত্নাকর যদি পাষণ্ডই হতো তাহ’লে পিতা, পুত্র, পত্নীকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে কেন যে, তারা তার পাপের ভাগী হবে কি না? তাহ’লে ঐখানেই ঋষিকে শেষ ক’রে ফেলত।

অর্জুনের কথা উঠল। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যচক্ষু দিলেন। অর্জুনের বিশ্বরাপ দর্শন হ’ল; এ থেকে তাঁর বোধির পরিবর্তন ঘটলো—অর্জুন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—দেখে কে? তাঁর (ইষ্টের) সঙ্গে যুক্ত না থাকলে দেখাই হয় না। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের সাথে যুক্ত ছিলেন ব’লেই বিশ্বরূপ দেখার সুযোগ হ’ল। অর্জুন যে ভাবভূমির উপর থাকতেন তার জন্যই তাঁর বিশ্বরূপ দেখা সম্ভব হয়েছিল। তবে বিশ্বরূপ-দর্শনের ফলে অর্জুনের যে অনুভূতি হয়েছিল—তা’ তো ঠিকই। মহাপুরুষের দর্শনের ফলে, সঙ্গলাভের ফলে কত-কত মানুষের কত পরিবর্তন হয়।

সার্বভৌম পণ্ডিত, চারিদিকেই তাঁর কত নাম—কত বড় পণ্ডিত! তারপর মহাপ্রভুর সঙ্গলাভ হ’ল। ভক্তিমার্গে চলে এলেন। রত্নাকরেরও তাই হয়েছিল।

তাহ’লে ব্যাপারটা কী হ’ল? ব্যাপারটা হ’ল এই—অনুভূতি, দর্শন, জ্ঞান সব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

প্রশ্ন—বিশ্বাসও কি এর সাথে থাকে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, সবই জড়িত থাকে। বিশ্বাস সবার মধ্যেই আছে। আবার হ’তে-হ’তে বিশ্বাস গাঢ় হয়।

বঙ্কিমদা (মন্ডল)—ঠাকুরের বাণীর ব্যাখ্যা থেকে মনে হচ্ছে, ভাব বা অনুভূতি থেকে বিশ্বাস আসে। এই ভাব বলতে কী বুঝব?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—’ভূ’-ধাতু থেকে ‘ভাব’ এসেছে। ‘ভূ’ মানে হওয়া । ভাব হয়েছে মানে সে-রকম (যে ভাবের কথা বলা হচ্ছে) হয়েছে।

বালক শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে আমাদের একটা অনুভূতি আছে। নাটকে শ্রীকৃষ্ণকে দেখে অনেকেই বলতে চায়—বাবা আমার বাড়ীতে এসো। আগে থেকে তো একটা ভাব আছেই। তা’ থেকেই ঐ অভিনয় দেখে সে-ভাব প্রকাশিত হয়। ঐ কৃষ্ণযাত্রার ছেলেকে নেমন্তন্ন ক’রে খাওয়াতে চায়। তার মানে শ্রীকৃষ্ণের ভাব পূর্ব থেকেই যা’ আছে তা’ এ অভিনয় দেখে ফুটে উঠেছে।

জগাই-মাধাই ছিল—অনাচার, ব্যভিচার কত করত, পরে সব ছেড়ে দিল। কিন্তু পূর্ব থেকেই একটা ভাব থাকা চাই। তাদের সে-ভাব ছিল। সকলের মধ্যেই সে-ভাব আছে তার মত ক’রে। পরমপুরুষের সঙ্গ ক’রলে সে-ভাব প্রগাঢ় হয়—পরিস্ফুট হয়। সেজন্য পরমপুরুষের দর্শন করলে, সাধুসঙ্গ করলে উপকার হয়ই। চোর, ডাকাত যেই হোক না কেন—তারই উপকার হয়।

যেখানে ভাব আছে সেখানে তার মধ্যে একটা হওয়া আছেই। হওয়া না থাকলে ভাব হয় কী ক’রে? তবে ঐ যে বললাম—পরিবর্তন হওয়ার কথা—তা-ও হয়, একটা sphere (স্তর) পর্য্যন্ত পরিবর্তন হয়।

তাই সকলের মধ্যেই ভাব আছে—হওয়ার যে soil তা’ আছেই। কিন্তু পরিবর্তন প্রত্যেকেরই নিজ-নিজ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হয়।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৫/৯/৭৪]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২০১-২০২]