যা’ ধারণা ….বা অসীম!

শান্তি ! শান্তি ! শান্তি

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীদুটি হলো:

যা’ ধারণা ক’রতে গিয়ে মন নিজত্ব হারিয়ে ফেলে—তাই অনন্ত বা অসীম!
শান্তি ! শান্তি ! শান্তি !

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—সব বোঝা গেল?

সকলে সম্মতিসূচক উত্তর জানাতেই শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন-“শান্তি ! শান্তি ! শান্তি !” তো বোঝা গেল না।

সতীশদা—পাঠ করলাম, ফলে আমাদের শান্তি-স্বস্তি এল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—পাঠ করেই আমাদের শান্তি-স্বস্তি এল, তা তো হয় না। সহজভাবে অর্থ করা যায় না?

জিতেনদা—শ্রীশ্রীঠাকুর শান্তি সম্বন্ধে বলেছেন—

“শান্তি মানে নিথর হয়ে
অলস অবশ নয়কো হওয়া,
সুধীবীক্ষণে সুচর্য্যাতে
সুনিষ্পাদনে ক’রে যাওয়া।”

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—’করাই পাওয়ার জননী’ কর, তাঁর পথে চললেই শান্তি আসবে। স্মরণ, মনন, নিদিধ্যাসন—এগুলি পালন কর; ঠাকুর বলেছেন—তুমি নিশ্চয়ই শান্তি পাবে, পাবে, পাবে।

পণ্ডিতদা—অসীমে গেলে হদয়গ্রন্থি মোচন হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। তখন complex-গুলি নিজত্ব হারিয়ে ফেলে। ধর, কেউ ঠাকুর দর্শন করতে এসে ঠাকুরের পাশে কয়েকজন মহিলাকে দেখে নিজের মত ক’রে ধারণা করে নিল। কিন্তু যখন সে ভাবল সব মেয়েই তো মা, তখন তার ঐ complex আর প্রশ্রয় পেল না। ঠাকুরের প্রতিও তার বিশ্বাস ভক্তি বেড়ে গেল।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৪/১০/৭৫ইং]

নির্দেশক্রমে অমল বাণীটির আলোচনা শুরু করল।

— আমি সমুদ্ৰে গেলাম। সমুদ্র এত বড় যে তা দেখে আমার মন হারায়ে গেল, সমুদ্রের ধারণায় মন ডুবে গেল। সমুদ্রের কূল-কিনারা কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সমুদ্র দেখে আমি নিজেকে হারায়ে ফেললাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মন নিজত্ব হারাল মানে? মন কী ক’রে নিজত্ব হারায়?

অমলকে সাহায্য করার জন্য রামগোপাল উত্তর দেয়।

—নিজত্ব হারায়ে গেল মানে আমি সমুদ্রের কাছে গেলাম, তারপর তার কোন কুল-কিনারা ঠিক করতে পারছি না।

অমল—সমুদ্রের কুল-কিনারা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার মন কোন হিসাব-নিকাশ করতে পারছে না, সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, আমার মন দেখছে অনন্ত ব্যাপার। মন নিরখ-পরখ করতে চায় তো—এটা কেন, ওটা কেন—এরকম প্রশ্ন করা এবং তা’ জানাই মনের বিশেষত্ব। এখানে মন তা’ ক’রে উঠতে পারছে না, সব ধারণার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

শ্ৰীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় প্রশ্ন করলেন— শান্তি! শান্তি! শান্তি!—কেন বলছেন ঠাকুর?

ছেলেরা বা মেয়েরা কেউ এ-প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় তিনি হরিপদদাকে (দাস) ঐ প্রশ্ন করলেন।

হরিপদদা—পরমপিতা অসীম, অনন্ত। এ অনন্তের চিন্তা করতে গিয়ে মনের নিজের কোন বোধ থাকে না। তখনই শান্তি।

শ্ৰীশ্ৰীপিতৃদেব—শান্তভাব না আসলে শান্তি আসে না। শান্তি এলে, তখন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, বাধা-বিঘ্ন কিছুই থাকে না। সমুদ্র সুদূর প্রসারিত। সমুদ্রের কূল-কিনারা আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের কাছে তো নাই! আমরা তাই বলি, সমুদ্র অনন্ত—যার কোন অন্ত নাই। তেমনি সাধক পুরুষেরা ঈশ্বরকে বলেন অনন্ত। ঈশ্বর যড়ৈশ্বর্য্যশালী; কিন্তু তার ঐশ্বর্য্যের পরিমাপ করা যায় না—তাই তিনি অনন্ত। অনন্তের মধ্যে গেলে বাধা-বিঘ্ন, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকে না। সেজন্য মন শান্ত থাকে। মন শান্ত থাকে বলেই শান্তি। মন শান্ত না হলে শান্তি থাকে না।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩১/৩/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৩২৮ – ৩২৯]