যে অনুভূতির … আড়ম্বর। –

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যে অনুভূতির খুব গল্প করে অথচ তার লক্ষণ প্রকাশ হয় না, তার গল্পগুলি কল্পনামাত্র বা আড়ম্বর।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

প্রতিদিনের মত আজও বাণীটি নানা ভাষায় পাঠ হওয়ার পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বাণীটি তীর্য (দাস), শুভা (সান্যাল), মিনতি (গাঙ্গুলী) ও ধীরা (মণ্ডল)—এই বালিকাদের পাঠ করতে বললেন। তৎপর তীর্যকে জিজ্ঞাসা করলেন—কেমন করে জানা যায়?

তীর্য—দীপ্তিদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছি। দীপ্তিকে দেখলাম। তখন জানলাম দীপ্তি বাড়িতে আছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে জানা গেল কী-ক’রে?

তীর্যকে নিরুত্তর দেখে এবার তিনি হৃষীকেশকে (দে) জিজ্ঞাসা করলেন।

হৃষীকেশ—অনুভব ক’রে জানা যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তোমরা তো ঠিকই বলছ, কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি না। (ক্ষণিক থেমে) স্বপ্না বল দেখি?

স্বপ্না—রানীর (মুখার্জী) অসুখ ক’রেছে —শুভা আমায় বলল, তখন রাণীর অসুখের কথা জানতে পারলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে জানলাম কেমন ক’রে? বল, কানে শুনে জানতে পারলাম । খাবারে নুন বেশী না কম হয়েছে, মিষ্টি বেশী না কম জিহবা দিয়ে অনুভব করি। হাওয়া বইছে কি-না ত্বক্‌ দিয়ে অনুভব করি। যে মাধ্যমগুলোর সাহায্যে জানতে পারি সেগুলোকে ইন্দ্রিয় বলে। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক দিয়ে আমরা জানতে পারি, জ্ঞান হয়। এগুলোকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলে। বাক্‌, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ—এগুলো দিয়ে আমরা কাজ করি। এগুলোকে কর্মেন্দ্রিয় বলে।

উপস্থিত বালক-বালিকাদের তিনি জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয় সমুদয় উচ্চারণ করালেন। সকলের মুখস্থ হওয়ার পর তিনি বললেন—আরো চারটি ইন্দ্রিয় আছে। সেগুলো হচ্ছে—মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহঙ্কার । এগুলো দিয়ে উপলব্ধি করা যায়, অনুভব করা যায়। এগুলোকে— অন্তরিন্দ্রিয় বলে। অতঃপর অন্তরিন্দ্রিয়গুলির নাম তিনি ছেলে-মেয়েদের উচ্চারণ করালেন।

বাণীটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ঠাকুর বলেছেন, যে অনুভূতির খুব গল্প করে, কিন্তু লক্ষণ প্রকাশ হয় না, তার মানে যার অনুভূতি হয়নি সে যদি অনুভূতির গল্প করে, তার গল্পগুলি আড়ম্বরপূর্ণ হয়, হৃদয়গ্রাহী হয় না। কোন বিষয়ের অনুভূতি হ’লে জ্ঞান হয় তো! যেমন দীঘায় সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে এসে একজন বলছে—এইরকম। তুমি তা’ কখনো দেখনি, অথচ তুমি বলছ—না, ওরকম নয়, এরকম, নানরকম কায়দা করে বানিয়ে তুমি বুঝাতে চেষ্টা করছ। তাহলে কী হবে? তুমি কলকাতা না দেখেই কলকাতার গল্প ক’রলে যেমন হয়, সেরকম হবে। আমি রসগোল্লা কখনো না খেয়েই গল্প করলাম। আর একজন খেয়ে বসে গল্প করল—আকার, আকৃতি, রঙ, স্বাদ সব অবলীলাক্রমে ব’লে গেল। তার মুখ-চোখ সব দিয়ে তা প্রকাশ পেল। আর আমি যে বানিয়ে বলছি, বলার ভাবেই তা’ ধরা পড়ে যাবে। খাওয়ার কোন লক্ষণই প্রকাশ পাবে না। আমরা দীক্ষা নিই কিজন্য? অশান্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য। দীক্ষা নিয়ে বীজমন্ত্র জপ করতে থাকি, ধ্যান করি, ইষ্টনির্দেশ মেনে চলি। ঠিকমত চ’ললে আমরা বহু জিনিস অনুভব ক’রতে পারি, ভেতরের বোধ দিয়ে দেখতে পাই। ইন্দ্রিয়গুলো না থাকলে আমরা কিছুই জানতে পারতাম না। এদের দিয়ে আমরা সব জানতে পারি। কথাবার্তা, চাল-চলন, হাব-ভাবের মধ্যে তা প্রকাশ পায়।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৫/২/৭৬ ইং ]

মদনদা বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বললেন—কেউ হয়তো প্রেম-ভক্তির অনেক গল্প করে, কিন্তু কখনও যদি তার গুরুজনকে ভক্তি করার ব্যাপার আসে তখন তা ঠিকমত প্রকাশ পায় না, সেগুলো ঠিকমত দানা বাধে না। তখন বলা যায় তার ওই বলাগুলি কল্পনামাত্র বা আড়ম্বরপূর্ণ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো ঠিক, কিন্তু অনুভূতি কেমন, কি অনুভূতি?

মদনদা—জীবনবৃদ্ধির অনেক কিছু অনুভূতি করে যাচ্ছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যেমন আধ্যাত্মিক চেতনা সম্বন্ধে অনুভূতি। অতক্ষণ নাম করলাম, জ্যোতি দেখলাম, কিন্তু ব্যবহারে প্রকাশ পেল না—সেগুলো কল্পনামাত্র বা আড়ম্বরযুক্ত।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৭/৭/৭৯ ইং ]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫]