যদি শিক্ষা….দেয় না। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যদি শিক্ষা দিতে চাও, তবে কখনই শিক্ষক হ’তে চেও না। আমি শিক্ষক, এই অহঙ্কারই কাউকে শিখতে দেয় না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব কালীকুমার পালদাকে আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন। কালীদা তপোবন বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

কালীদা—আমি যখন ছাত্রকে শিক্ষা দেব আমি নিজে ছাত্র এই ভাব রেখে শেখাব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তুমি স্কুলে ছাত্রদের পড়াচ্ছ, তুমি ছাত্র ভাববে কিরকম?

কালীদা—আমি শিক্ষা দিচ্ছি, আমার শিক্ষা হয়ে গেছে, কিছু শেখার নেই এরকম ভাব থাকলে শিক্ষা দিতে পারব না। আমি শিক্ষক আমার কিছু শেখার নেই এই ভাব থাকা চলবে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, আমিই সবজান্তা, আমার কিছু শেখার নেই এরকম দাম্ভিকতা থাকা ভাল নয়।

কালীদা—অনেক শিক্ষক আছেন, নিজের জ্ঞান সম্বন্ধে বড়-বড় কথা বলেন। অহংকার আছে তাই অপরের কথা শোনেন না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অহংকার থাকলেই বা শুনবে না কিরকম?

কালীদা কিছু বললেন। কিন্তু বক্তব্য বেশ পরিষ্কার হচ্ছে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কেন শুনতে চায় না, আসল কারণটা তো বলতে হবে।

কালীদা—অহংভাব আছে, তাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অহং তো সকলেরই আছে।

অতঃপর শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—শিক্ষক ও ছাত্র দুটো সাইড। একজন শিক্ষা দিচ্ছে, আরেকজন গ্রহণ করছে। যে শিক্ষা নেয় তার কাছ থেকেও অনেক নেওয়ার আছে, যে দেয় তাকেও দেওয়ার আছে। অহং-এর চর্চা করতে করতে এমন একটা অবস্থা আসতে পারে যখন সে stiff হয়ে যায়, যেমন জল আমরা ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারি। সেই জলই জমে বরফ হযে যায়। কঠিন অবস্থা। তখন সব পাত্রে তা রাখা যায় না। অহং যত পাতলা থাকে, তার ভিতর ভালবাসাও তত বেশি । অহং যত stiff তার ভিতর তত তিতিক্ষার অভাব, ধৈর্যের অভাব, অপরকে বুঝার অভাব। ক্যান্‌, এরকম হয় ক্যান্‌? না, ভালবাসা নাই। অহং শক্ত হয়ে গেলে মানুষ ভালবাসতে পারে না। শিক্ষকের যদি ছাত্রের প্রতি ভালবাসা থাকে সেই টানেই সে ছাত্রকে শিক্ষাদান করে আনন্দ পাবে, ছাত্রের সুবিধা অসুবিধা অনুভব করতে পারবে। ছাত্রও আনন্দ পাবে সেই শিক্ষকের পাঠগ্রহণে। এটাই পাতলা অহং-এর লক্ষণ।

আগেকার দিনে শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক ছিল কত নিবিড়। পড়ার জন্য শিক্ষক ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে পাঠাতেন, আদর করতেন, খাওয়াতেন। আবার মারধরও করতেন খুব। শাসন করলে ছেলের বাবা-মা কিছুই বলতো না। তারা জানতো মারধর করুক বা যাই করুক ছেলের মঙ্গলচিন্তা থেকেই শাসন করছেন। তাছাড়া ছাত্রের বাড়ির নানাবিধ সমস্যার সঙ্গেও তারা জড়িয়ে থাকতেন। শিক্ষক কত সম্মান পেতেন, দোকানদার, সরকারী কর্মচারী, সাধারণ গৃহস্থ শিক্ষককে দেখে শ্রদ্ধায় উঠে দাঁড়াত।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩১/৩/৭৮]

রানী (মুখার্জী) আলোচনা করার সুযোগ পেয়ে বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বলল—আমি যদি কাউকে শিক্ষা দিতে চাই তাহলে শিক্ষক হতে চাইব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—শিক্ষক কে?

রাণী চুপ থাকায় নিজেই বললেন—যে শিক্ষা দেয় সে শিক্ষক। যে শিক্ষা নেয় সে ছাত্র। শিক্ষক যদি ভাবে আমি শিক্ষক, শিখাব—ও শিখবে। মনে মনে শিক্ষকের এই অহংকার থাকলে ছাত্রের মনে আঘাত লাগে, ভয় করে। মন খুলে কিছু বলতে পারে না। শিখতে দেয় না মানে—শিখতে পারে না। শিক্ষকের ঐ ভাবের জন্যই ছাত্র শিখতে পারল না। তাই সেই অহংকার রাখতে হয় না। ছাত্রকে আপনজন মনে করে শিখাতে হয়।

[ পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং- ২৩/৫/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ৪৯]