সঙ্কোচই দুঃখ, ….. তাই দুঃখ। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সঙ্কোচই দুঃখ, আর প্রসারণই সুখ। যাতে হৃদয়ে দুর্ব্বলতা আসে, ভয় আসে— তাতেই আনন্দের খাঁকতি—আর তাই দুঃখ।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

প্রশ্ন উঠল—সংকোচ কী আর প্রসারণই বা কী? সংকোচই দুঃখ কেন?

হরিপদদা (দাস)—যখন নিজের কথাই ভাবি, নিজের কথাই চিন্তা করি, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ি, তখনই সংকোচ আসে। যখন ইষ্টের কথা ভাবি, ইষ্টকে ভালবাসি, সবাইকে ইষ্টের ভাবি—তখনই প্রসারণ আসে, সুখ তখনই হয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো ঠিক। সহজভাবে উদাহরণ দিয়ে বোঝান যায় না? গুরুকিংকর কী বলে ?

গুরুকিংকরদা—কাপড়চোপড় না থাকলে সমাজে মিশতে পারি না। তখনও সংকোচ আসে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কাপড়চোপড় নাই মানে?

গুরুকিংকরদা—কাপড় ময়লা থাকে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এটা হ’ল সদাচারের অভাব। এটা হল below standard.

গুরুকিংকরদা—তাছাড়া অনেকে টেরিলিন, টেরিকটন পরে, সেখানে আমি যদি সাধারণ সূতীর পোশাক পরি, সেখানেও সংকোচ আসতে পারে। বাকী লোকেরা তখন, আমার মনে হয়, কেউ আমার সাথে মিশবে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাতে কি হ’য়েছে? কত লোক তো টেরিলিন, টেরিকটন পরে না। সাধু-সন্ন্যাসী কত নেংটি পরে থাকে। কত রাজা মহারাজা তাঁদের দর্শন করতে যায়। তাঁদের সেবা ক’রে মানুষ ধন্য হয়।

কাপড় নোংরা হ’লে সংকোচ আসতে পারে। দামী কাপড় যদি না-ই থাকে, কিন্তু যদি সদাচারী হয়, তারও তো একটা society (সমাজ) আছে, তার সাথে মিশতে পারে। তুমি (গুরুকিংকরদাকে) কোলিয়ারী যাও (যাজন কাজে) প্যান্ট কোট প’রে নাকি?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—আসলে অন্যায় কাজ করলে সংকোচ আসে। তাছাড়া এমন কোন কাজ—অন্যায় বুঝছি, তা’ যদি করি তাতে সংকোচ আসে। অন্যায় কাজ করলাম প্রকাশ করতে পারলাম না, এতেও সংকোচ আসে। ধর, নকল করে এম, এ পর্যন্ত পাশ করলাম, ভাল চাকরীও যোগাড় করলাম কিন্তু মনে-মনে ঠিকই বুঝি কি করে পাশ করেছি। খেতে-খেতেও মনে পড়ে।

আবার দেখবে একজন হয়তো পাশ করতে পারল না, তাই বেগুনী ভাজতে আরম্ভ করল, তেলেভাজার ব্যবসা করতে-করতে দু’চারখানা বাড়িই করে ফেলল। তার কোন সংকোচ নেই, লোকে বলবে, বেগুনী বিক্রি ক’রে বাড়ি করেছে। সে আস্তে আস্তে বৃদ্ধির পথে যেতে থাকে। এমন ক’রে চলতে-চলতে তার সদগুরু লাভও হ’তে পারে।

আর যে ফাঁকি দিয়ে পাশ করেছে সে সাহেবের গুঁতো খাচ্ছে। ভুল-ভ্রান্তি হচ্ছে। তার post-ও চলে যেতে পারে—এ-রকম হয় অনেক। সে দেবতার কাছে প্রণাম করতে গেলেও দুর্বলতা থাকে, মনে শান্তি পায় না।

কৃপাসিন্ধু—দেশ-সেবার নাম ক’রে অনেকে খারাপ কাজ করে কিন্তু সেটা তারা খারাপ মনে করে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু society-তে (সমাজে) তো তার reaction (প্রতিক্রিয়া) হয়। দেশবাসী তাদের support করে না। তাই আস্তে-আস্তে তারা দমিত হয়। আবার যদি তারা ভাল কাজই করে, আদর্শ যদি ঠিক থাকে, তখনকার সমাজ বিরোধিতা করলেও, তাদের ফাঁসিতে যেতে হলেও পরে সারা দেশ তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও এরকম বহু নজির আছে।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৪/১১/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৮,১৯]