সত্য বল, কিন্তু সংহার এনো না।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সত্য বল, কিন্তু সংহার এনো না।”

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সত্যং লোকহিতং প্রোক্তং—শাস্ত্রে আছে। আর সংহার কথার অর্থ—বিনাশ, প্রলয়, ধ্বংস। একটা চোর চুরি করেছে। যে কারণে হোক (স্বভাব দোষে অথবা পেটের দায়ে) তার বিচারে তাকে জেল খাটতে হবে এবং টাকা জরিমানা দিতে হবে। যদি কোন সৎলোক সাক্ষী দেয় যে না চুরি করেনি তবে মকুব হয়ে যায়। যদি উপযুক্ত সাক্ষী না পায় তবে সারা জীবন জেল খাটতে হবে। ফলে তার স্ত্রী-পুত্রাদি অনাহারে মারা যেতে পারে।

এখন দেখতে হবে মানুষটাকে। যদি মানুষটা ভাল হয় বা এখন থেকে ঠিক মত চলবে, কখনো ভুল করবে না, আর চুরি করবে না, তার স্বভাব পরিবর্তন করে চলতে চায় বোঝা যায়, এক কথায় এবার থেকে তার দ্বারা মঙ্গল কাজ ছাড়া অমঙ্গল কিছুই ঘটবে না এমনতর বোঝা যায়—তবে এই কথাই বলা ভাল চুরি কখনো হয়তো করেছে, বহু আগে। এখন আর করে না। এই বলে মকুব করা ক্ষতি নেই।

আর যদি দেখা বা বোঝা যায়—এ ব্যক্তির দ্বারা জগতের কোন মঙ্গল সাধন তো হবেই না পরন্তু অমঙ্গলই করবে। জীবনে উন্নতি করতে পারবে না—সে ক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য যা তাই বলে শাস্তি বিধান শ্রেয়। ….

আরও সহজভাবে বোঝার জন্য শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ছোট ছেলেমেয়েদের অসুখ করলে বলি—ইনজেকসন নিলে লাগে না, নিয়ে নে। আসলে কি তাই? লাগেই। কিন্তু তার মঙ্গল চাই বলেই এইরকম বলতে হয়। আসলে এরকম বলাটা কিছুই নয়, তা বলতে হয় পরিস্থিতি অনুযায়ী। যদি প্রকৃত সত্য যা, তা বলি ‘লাগে’ তাহলে নেবে না। অসুখ সারবে না। হয়তো বা মৃত্যুই তার সুনিশ্চিত হয়।

আসল কথা—ইষ্ট ও ইষ্টস্বার্থপ্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি কোন বাধা আসে আর তাতে যদি চাতুরীর আশ্রয় নিতে হয়, তবে তা মঙ্গলের জন্য নেওয়া ভাল। তাঁকে খুশী করাই যখন আমার সাধনা তখন দুটো একটা কৌশল প্রয়োগে কিছু যায় বা আসে না। শাস্ত্রে আছে—যোগঃ কৰ্ম্ম সুকৌশলম। হঠাৎ আমি ভক্ত হয়ে ‘আমি ইষ্টের কাজ করছি, এরকম বলি কি করে’—এইরকম বক ধার্ম্মিক হওয়ায় লাভ নেই। বরং তাঁর খুশীর জন্য যখন যা করা লাগে তাই করাই কর্তব্য। তাই বলে—ভুলেও কখনো নিজের স্বার্থ পরিপুরণের জন্য যেন মিথ্যার আশ্রয় না নিই। তাহলে সব পণ্ড হয়ে যাবে।

এই প্রসঙ্গে পিতৃদেব আরও একটা গল্প বললেন—এক সাধু তে-মাথা রাস্তার উপর বসে ধ্যান করছেন। কিছু দূরে এক ব্যাধ একটা শূকরকে লক্ষ্য করে তীর ছোঁড়ে। তীরবিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে শূকরটি দৌড় দেয়। সাধুর সামনে দিয়ে কোন দিকে গেল দেখতে পাওয়া গেল না। ব্যাধ তাড়াতাড়ি সাধুর কাছে গেল এবং জিজ্ঞাসা করল—তীরবিদ্ধ একটা শূকর দেখেছেন? তখন সাধু মহাশয় এই কথাই বললেন—“চোখ দেখে বলতে পারে না, কান শোনে দেখতে পায় না।” সাধু মহাশয়ের কথা ব্যাধের হেঁয়ালীর মত শোনাল এবং বিরক্ত হয়ে নিজে দৌড় দিল শূকরকে খুঁজে বের করার জন্য।

অমিতাভদা—আজ্ঞে, এখন বুঝতে পারলাম।। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী কাজ করতে হয়। তাঁর সাথে “যোগযুক্ত” থাকলে কখন কি করণীয় তা আপনা থেকে হয়ে যায়। আর তা সম্ভব হয় নাম জপের মধ্য দিয়ে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ওটাই জীবনে চলার সহজ উপায়।

[ তাঁর সান্নিধ্যে/তাং-৮/৬/৮২ইং]

—মেয়েদের আলোচনায় তীর্যরানী দাস বাণীটি আর একবার পাঠ করে চুপ থাকলে শ্রীশ্রীপিতৃদেব তাকে বললেন—কি রে বসে বসে খাবি খাচ্ছিস নাকি?

ততক্ষণে তীর্য বলে—সত্য মানে ইস্ট।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সত্য মানে ইষ্ট। ইষ্ট বল, কিন্তু সংহার এনো না।—বাণীটা এই নাকি?

তীর্যরানী তখনও চুপ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ইস্ট যদি হয়—বোঝায়ে দিবি তো কথাটা । সত্য মানে যার বিদ্যমানতা আছে। ইষ্টই হোক, বিদ্যমানতা হোক কথাটা মিলায় দিবি তো! ‘বল’-র সঙ্গে বিদ্যমানতা, ইষ্টের সম্পর্কে কি? সত্য মানে ইষ্টই যদি হয়—তাহলে যা বললে ইষ্ট হয়, ইষ্ট মানে মঙ্গল যাতে হয়, যাতে বিদ্যমানতা অক্ষুণ্ণ থাকে তাই করা। তাই ঠাকুর বলছেন—এমনভাবে বল যাতে ইষ্ট হয়, মঙ্গল হয়। এমনভাবে বল না যাতে ধ্বংস হয়। সত্য বললাম কিন্তু ধবংস হল তাতে তো উল্টো হল। সোনার পিতলে ঘুঘু হয় তাহলে । সত্য মানে তাই যাতে মানুষের কল্যাণ হয়, মঙ্গল হয়, বিদ্যমানতা অক্ষুণ্ণ থাকে। এমনভাবে বললাম যাতে অস্তিত্ব ক্ষুন্ন হয়ে গেল, তা যেন না হয়।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৪/৭/৭৯ ইং]