সন্দেহের নিরাকরণ …প্রাপ্তি। -ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সন্দেহের নিরাকরণ ক’রে বিশ্বাসের স্থাপন করাই জ্ঞানপ্রাপ্তি।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

হরিপদদা (দাস)—বিশ্বাসীর অনুসরণ করার ফলেই সন্দেহের নিরাকরণ হয়, আর তাই জ্ঞানপ্রাপ্তি। বিশ্বাসস্থাপন ও জ্ঞানপ্রাপ্তি তাহ’লে একসাথেই হয়?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, তাই। প্রকৃত বিশ্বাস-প্রসঙ্গে বললেন (হরিপদদাকে)—তুমি বিশ্বাস কর ঠাকুর সর্বত্রই আছেন?

হরিপদদা—হ্যাঁ।

—তুমি তা’ দেখায়ে দিতে পার?

—না।

—তাহ’লে এটা কেমন বিশ্বাস?

সবাইকে চুপ থাকতে দেখে পুনরায় তিনি বললেন—বিশ্বাস মুখের কথা নয়। প্রকৃত বিশ্বাস হ’লে চরম জ্ঞান হয়। চরম জ্ঞান অর্থাৎ তার ওপরে আর জ্ঞান নেই—আমার এ-রকম মনে হয়। প্রহ্লাদ বিশ্বাস করতো, তার নারায়ণ সব জায়গায় আছেন এমন-কি pillar (থাম)-এর মধ্যেও আছেন, আর তা’ সে দেখায়েও দিল। আমরা অনেকেই বিশ্বাস করি ঠাকুর সব জায়গায় আছেন, কিন্তু তা’ দেখাতে পারি না।

প্রকৃত বিশ্বাসীই প্রকৃত জ্ঞানী। তার ওপর কোন জ্ঞান নেই। নাম-ধ্যান ক’রে সমাধিস্থ হওয়া প্রকৃত বিশ্বাসের ফলেই হয়। যতক্ষণ তাঁর (ইষ্টের) প্রীতি জীবনের মুখ্য না হয়, ততক্ষণ সে-ভাব আসে না। তাঁর প্রীতিবর্ধনই আমার একমাত্র কাম্য—এই হ’ল প্রকৃত জ্ঞান। জীবনের উদ্দেশ্যই এই।

যেমন, শ্রীমন্‌ মহাপ্রভুর পরম ভক্ত গদাধর পণ্ডিত। শ্রীক্ষেত্রে মহাপ্রভুর সঙ্গেই সর্বদা থাকত। মহাপ্রভু একদিন নীলাচল (শ্রীক্ষেত্র) ছেড়ে বৃন্দাবনে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। গদাধর বলল—আমিও আপনার সঙ্গে যাব। মহাপ্রভু তার সঙ্কল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন—তুমি যে বলেছিলে নীলাচলেই থাকবে?

গদাধর উত্তর করল—প্রভু, আপনি যেখানে সেখানেই আমার নীলাচল।

—আর তোমার বিগ্রহ (গোপীনাথ বিগ্রহ)?

—আপনিই আমার জীবন্ত বিগ্রহ।

মহাপ্রভু নীলাচল ছেড়ে রওনা হলেন গৌড়পথে—বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে। গদাধরও পিছু নিল। কটক পর্যন্ত মহাপ্রভুর সঙ্গে চলে এসেছে গদাধর। প্রভু তাকে কাছে ডেকে বললেন—তুমি কী চাও? নিজের প্রীতির জন্যই তুমি যেতে চাইছ? কোনটা কাম্য—তোমার প্রীতি, না আমার প্রীতি? আমার প্রীতিই যদি তোমার কাম্য হয় তবে তুমি নীলাচলেই থাক।

গদাধর নির্বাক। প্রভুর আদেশে সার্বভৌম পণ্ডিত গদাধরকে নিয়ে চললেন নীলাচলে।

কাহিনী শেষ ক’রে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—তাঁর (ইষ্টের) প্রীতিবদ্ধ হওয়াটাই আমাদের করণীয়। সেটাই আত্মপ্রসাদ।

ইষ্টের প্রীতিসাধনের কথা উঠল। ভরত-শত্রুঘ্নের রামের প্রতি প্রীতি, বিভীষণের রামের প্রতি প্রীতি প্রভৃতি ঘটনা শ্রীশ্রীপিতৃদেব ব্যক্ত করলেন। বিশেষ জোর দিয়ে তিনি বললেন—হুনুমান একজন ভক্ত। কিন্তু প্রভুর প্রীতিসাধনের জন্য কি-ই-না করেছে হনুমান! গর্ভবতী নারীকে লাথি মেরে গর্ভপাত ঘটিয়েছে; কৌশলে রাবণের মৃত্যুবাণ হরণ করেছে। সবই কিন্তু প্রভুর স্বার্থ রক্ষায়। প্রভুর স্বার্থরক্ষাই তার জীবনের একমাত্র ব্রত। তাঁর প্রীতিসাধনই হনুমানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল।

এবার বিশ্বাসের অন্তরায় প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—আমরা কতরকমে যে নিজেদের আবদ্ধ ক’রে রাখি, কত রকমে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাই তা’ আমরাই ধারণা করতে পারি না। ধারণা করতে পারে সে-ই, যে অকপটে ইষ্টের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে পারে। তারাই নিজেদের ধরতে (বুঝতে) পারে যারা ইষ্টের প্রীতি কামনায় কর্ম ক’রে চলে।….. করার ক্ষমতা, পারার ক্ষমতা সবারই আছে। কিন্তু সে-রকম করা হয়ে ওঠে না। যেমন আমরা বলি, লোকটার দীক্ষা নেওয়ার খুব ইচ্ছা, কিন্তু মাছ ছাড়তে পারে না—এ-রকম আর কি! এটা একটা gross(স্থূল) উদাহরণ। এর থেকে finer-ও (সূক্ষ্মও) আছে। ঠাকুরের বলা আছে

“ইষ্টের চেয়ে থাকলে আপন
ছিন্নভিন্ন তার জীবন।”

সে ছিন্নভিন্ন হয়, মায়ায় আবদ্ধ হয়। অথচ সে ভাবে ইষ্টকে কত ভালবাসি। (একটু থেমে) সবই করতে হবে—কিন্তু নিজেকে তাঁর কর্মচারী ভেবে। সবাই তাঁর (ইষ্টের)এই ভাব রেখে। সংসারী হয়েও সন্ন্যাসী থাকতে হবে।

পূৰ্ণ বিশ্বাস হ’লে সব adjusted (নিয়ন্ত্রিত) হয়। আমাদের মধ্যে বিশ্বাস আছেই, কিন্তু পূর্ণ বিশ্বাস থাকা চাই। এটা নিমেষেই হ’তে পারে, আবার সময়ও লাগতে পারে।

সতীশদা—আজ্ঞে, শাস্ত্রে আছে, গুরুকৃপা হ’লে সব হয়। আবার ঠাকুর বলছেন, কৃপা হ’ল ক’রে পাওয়া।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, তাই। করাই পাওয়ার জননী। ঐ করাটা এক নিমেষেই একশ’ বছরের হ’য়ে যেতে পারে।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-২৯/৯/৭৪ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২১০ – ২১১]