সরল হও, কিন্তু বেকুব হ’য়ো না। – ব্যাখ্যা 

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সরল হও, কিন্তু বেকুব হ’য়ো না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। ধর, একবার ট্রেনে করে যাচ্ছি, হঠাৎ এক ভদ্রলোক উঠলেন একটা স্টেশন থেকে, সঙ্গে আছে মাঝারি ধরনের ট্রাংক। বেশ কয়েক স্টেশন গিয়ে ভদ্রলোকটি বললেন—দাদা এই ট্রাংকটা একটু দেখবেন, আমি খাবার জল নিয়ে আসছি, বারে বারে বললেন একটু দেখবেন কিন্তু। ভদ্রলোক যে নামলেন আর ফিরলেন না। যথা সময়ে ট্রেন ছেড়ে দিল। ভাবলাম, ভদ্রলোক সময় মত নির্দিষ্ট কামরায় পৌঁছানোর আগেই ট্রেনটি ছেড়ে দিয়েছে। নিশ্চয় অন্য কোনও কামরায় উঠেছেন। বেশ কয়েকটা স্টেশনে ট্রেন থামল, কিন্তু ভদ্রলোক এ নির্দিষ্ট কামরায় ফিরে এলেন না। অথচ পরের স্টেশনে নামতে হবে। কি করব ঠিক করতে অনেক সময় চলে গেল। শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছান গেল, ট্রাংকটা সঙ্গে করে নামলাম, যদি কোনভাবে পৌঁছান সম্ভব হয়। হঠাৎ কি মনে হল, আচ্ছা দেখা যাক কি আছে। ট্রাংকটার কাছে যেতেই বাজে গন্ধ পেলাম। মনে মনে ভাবলাম যা অনুমান করছি তা যদি হয় সমূহ বিপদ। ট্রাংকটা নিরাপদ স্থানে খুলে দেখি খুন করা একটা মৃতদেহ। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে রিকশা করে নিয়ে নদীতে ফেলে দিয়ে তবে রেহাই। রিকশওয়ালাকে সাহায্য করার জন্য বেশী পয়সা দিলাম। আর যদি পুলিশের হাতে পড়তাম তবে জান নিয়ে সমস্যায় পড়তাম।

ঠাকুর করুণাময়, সময় মত উপস্থিত বুদ্ধিতে সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম। তাই ঠাকুর বলেছেন—সরল হতে, তাই বলে বেকুব যেন না হই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের উদাহরণ দেওয়া শেষ হতে না হতে সতীশদাকে ছটফট্‌ করতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন—তুই কিছু বলবি?

সতীশদা—আজ্ঞে, যদি অনুমতি দেন তবে আমার জীবনের একটা ছোট ঘটনা বলব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব ঘড়ি দেখে বললেন—ছোট করে বলিস।

সতীশদা—একবার ইষ্টকাজে কোলকাতায় রাত্রে ৬৮, সূর্য্য সেন স্ট্রীটে থেকেছি। পরের দিন ইষ্টভৃতি পাঠানোর দিন। খোঁজ নিয়ে জানলাম আমহার্স্ট স্ট্রীট পোষ্ট অফিস সাতটা সাড়ে সাতটায় খুলে যায়। ঠিক করেছি ইষ্টভৃতি পাঠিয়ে গন্তব্যস্থলে পাড়ি দেব। যথারীতি মানি অর্ডার লাইনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছি। এমন সময় আমার ঠিক পিছনে এক ২২/২৩ বছরের যুবক হন্তদন্ত হয়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে আমাকে বলছে, দাদা, আমার মা খুব অসুস্থ, ডাক্তারবাবুকে ফোন করব, আমার লাইনটা একটু দেখবেন। কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে মানি অর্ডার ফর্মটা হাতে গুঁজে দিয়ে ফোনের কাউন্টারের দিকে যাচ্ছেন। আমি থতমত্ খেয়ে দেখি ফর্মটার মধ্যে কোন টাকা নেই। আমি তখনই বলি আপনার লাইনটা আমি দেখছি। ফর্মটা নিয়ে যান। ফর্ম তো কেউ দেয় না। ছেলেটি বলল—ও, ভুলে দিয়ে ফেলেছি। লাইনে দাঁড়ানো আমার সামনের বয়স্ক ভদ্রলোক বললেন—বড় একটা বিপদ থেকে বেঁচে গেলেন। আজকাল উঠতি মস্তানরা নানা অছিলায় সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলছে। আপনার ধুতি পাঞ্জাবি পরা দেখে টুপি পরাতে চেয়েছিল, সম্ভব হল না। আর বললেন—দেখবেন, ঐ মস্তান আর ফিরে আসবে না। মাঝে মাঝে এ রকম ঘটনা ঘটছে। সত্যি সত্যি ঐ যুবক পনের মিনিটের মধ্যে ফিরে এল না। আর একটু হলে আমাকে বেকুব বানিয়ে দিত। বলত টাকা সমেত আপনাকে মানি অর্ডার ফর্ম দিয়েছি। এখন অস্বীকার করছেন।

[ তার সান্নিধ্যে/তাং-১৪/৪/৭৭ ইং]


মেয়েদের আলোচনায় কৃতিদেবতা চৌধুরী বাণীটি আর একবার পাঠ করল শ্রীশ্রীপিতৃদেব জিজ্ঞাসা করলেন—সরল হওয়া মানে কি?

—সহজ।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে-ই তো, সহজ মানে কি?

—যার মনের মধ্যে কোন প্যাঁচ নাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, সেইটা বল্‌। যার মনের মধ্যে কোন প্যাঁচ থাকবে না। সোজা । ঠাকুর কি বলেছেন?

— “সরল হও, কিন্তু বেকুব হয়ো না।” মনে যা আছে তাই বলি, কিন্তু বেকুব হব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। সরল হওয়ার সাথে বেকুব হওয়ার সম্পর্ক কি? বেকুব মানে কি?

—বোকা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—অনেকে সহজ-সরল; কিন্তু বোকা নয়। আর একজন সহজ-সরল কিন্তু বোকা। বোকা মানে কি?

—যার বুদ্ধি নাই।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো ঠিক, কিন্তু কিসে বুদ্ধি নাই বোঝা যাবে? যেমন যাকে যেটা বলা উচিৎ নয়—সেটা বলে ফেলল, যে কাজটা করা উচিৎ নয় সেটা করে ফেলল। তারা সরল কিন্তু বোকা। এই রকম বলে না? “মাকে এই কথাটা বলে নাকি বেকুব।”—তাই ঠাকুর বলছেন—সহজ-সরল হও—মনের মধ্যে কোন প্যাঁচ রেখো না, কিন্তু বেকুব হয়ো না।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-১৭/৮/৭৯ ইং]