যদি সাধনায় উন্নতি….কর। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ -এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যদি সাধনায় উন্নতি লাভ ক’রতে চাও, তবে কপটতা ত্যাগ কর।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

বাণীটি নানাভাষায় পাঠের পর শ্রীশ্রীপিতৃদেব তনুদাকে (নিখিল ঘটক) আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

তনুদা—মনে একরকম ভাবছি, মুখে অন্যরকম বলছি এটাই—কপটতা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মুখে অন্যরকম বলতে কী বুঝায়? পরিষ্কার ক’রে বল্‌ যেন সবাই বুঝতে পারে।

তনুদা—যেমন, আমি স্বার্থধান্ধা নিয়ে দীক্ষা নিলাম, বড় ভক্ত হওয়ার, বড় সাধক হওয়ার ভাব দেখাচ্ছি। সেই ভাব অনুকরণ ক’রে চলছি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে তো ঠিকই আছে, যেমন উদ্দেশ্য ছিল সেইরকমই তো করছি। ভক্ত বা সাধকের ভাব অনুকরণ করতে-করতেও ভক্ত বা সাধক হওয়া যায়। কিন্তু ঠাকুর বলেছেন, আত্মোন্নয়ন করতে গেলে কপটতা ত্যাগ করতে হবে। সেটা কেমন? এই যেমন, মুখে বললাম, মিথ্যা কথা বলা ভাল না, কিন্তু কাজের বেলা তা’ মানছি না। ধর, ননীদা আমায় জিজ্ঞাসা করলেন— গোবর্ধন কি এসেছে? গোবর্ধন এসেছে। এই সত্য কথাটা বললে ননীদার পক্ষেও সুবিধা । কিন্তু আমি বললাম— না। কিংবা, একজন হয়তো জিজ্ঞাসা করছে—এখানে ফাউন্টেন পেনটা পড়ে ছিল, দেখেছেন? আমি বললাম—না-তো। অথচ একটু আগেই পেনটা কুড়িয়েছি। কিংবা, আমি উপদেশ দিচ্ছি— রোজ সকাল-সন্ধ্যা প্রার্থনা করবে, প্রত্যহ অতিপ্রত্যূষে ইষ্টভৃতি করবে,—অথচ আমারই ঠিক নেই। কোনদিন ৭টায় কোনদিন ৮টায় করছি। প্রার্থনা করারও ঠিক নেই।. . .অপরকে উপদেশ দেবার আগে আমার চরিত্রে তা’ মূর্ত ক’রে তোলা চাই।

ঠাকুর বলেছেন—“মাছ-মাংস খাসনে আর/পিঁয়াজ-রসুন মাদক ছাড়।” “উষানিশায় মন্ত্রসাধন, চলাফেরায় জপ/যথাসময় ইষ্টনিদেশ, মূর্ত করাই তপ।” তিনি যা’ যা’ বলেছেন তাই-তাই করার সংকল্পও নিয়েছি, কিন্তু সেগুলো ঠিক-ঠিক পালন করছি না। তাই সেটা কপটতা, এর ফলে উন্নতিলাভেও বহু বিলম্ব হয়ে যাবে। ঠাকুর বলেছেন—সাধনার ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, আনুগত্য, কৃতিসন্বেগ প্রয়োজন। কি অঙ্কশান্ত্র, কি বিজ্ঞানশান্ত্র সব জায়গাতেই ঐ রকম।

তাঁর (ইষ্টের) প্রতি বিশ্বাস রাখতে হয় আর সেজন্য অকপট হ’তে হয়।

গুরুকিঙ্করদা—আজ্ঞে, অকপট হ’লেই তো তাঁতে প্রকৃত বিশ্বাস আসে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ, তাইতো । আর যখন তাঁতে বিশ্বাস পাকা হয় তখন অভাবনীয় ঘটনাও ঘটে।

এ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীপিতৃদেব এক কাহিনী ব্যক্ত করলেন।

এক গোয়ালিনী ছিল। সে তার গ্রাম থেকে প্রত্যহ ছোট একটা নদী খেয়া-নৌকায় পার হ’য়ে এপারে দুধ বিক্রী করত। কোন-কোনদিন বাড়ি ফিরতে তার দেরী হ’য়ে যেত। এপারে এ গ্রামের মন্দিরে হরিকথা হত। একজন কথক হরিকথা বলতেন।

গোয়ালিনী কথকের হরিকথা আকণ্ঠ পান ক’রে পরম তৃপ্তিলাভ করত—আনন্দে মন তার ভরপুর হ’য়ে যেত।

এরকম একদিন আবার গোয়ালিনী সেই কথকের কথা শুনছে। আরও কত লোক—সবাই শুনছে। কথক বলছেন, ‘গভীর বিশ্বাসে সবই হ’তে পারে। ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়াও আশ্চর্য নয়; মরা মানুষও ঈশ্বরের দয়ায় প্রাণ লাভ করে’—ইত্যাদি। সবাই নির্বাক হ’য়ে তাঁর হরিকথামৃত পান করছে। এক সময় কথকের কথা শেষ হ’য়ে গেল। গোয়ালিনী তাঁকে প্রণাম ক’রে গৃহাভিমুখে যাত্রা করল।

কথক-ঠাকুর গোয়ালিনীর কাছ থেকে দুধ নিতেন। কিন্তু নদীর খেয়া পারাপারে বিভ্রাট থাকায় পার হ’য়ে আসতে প্রত্যহ তার বেলাই হয়ে যেত। কিন্তু পরদিন গোয়ালিনী সকাল-সকাল এসে হাজির। কথক-ঠাকুরের বাড়িতে দুধ দিয়ে তাকে প্রণাম ক’রে দাঁড়াতেই কথক-ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ এত সকাল-সকাল কেমন ক’রে এলি?’ ‘কেন? হরিনাম করতে-করতে হেঁটে নদী পার হ’য়ে এলাম’, উত্তরে সে বলল। ‘সে কি রে হেঁটে নদী পার হ’য়ে এলি—সে-ও কি সম্ভব?’ ‘আপনার মুখেই তো কাল শুনলাম—উপায় আমাকে জানিয়ে দিলেন। আপনার দয়াতেই তা’ লাভ করেছি।’ ‘চল তো দেখি কেমন ক’রে নদী পার হলি’ ব’লেই কথক-ঠাকুর সঙ্গে-সঙ্গে উঠে পড়লেন। গোয়ালিনীকে সঙ্গে নিয়ে নদীর ধার গেলেন। গোয়ালিনীর বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। সে নদীতে নেমে হরির নাম করতে-করতে অগ্রসর হচ্ছে। পেছনে কথক-ঠাকুরকে দেখে ডাকল, ‘আপনিও আসুন’। কথক-ঠাকুর নদীর জলে পা রাখতেই পা ডুবে গেল। চোখে তাঁর অশ্রুধারা। বললেন, ‘মা তুই-ই ধন্য!’

ভবানীদা—আজ্ঞে, পুরোপুরি নির্ভরতা না এলে কি তাঁর দয়া লাভ করা যায় না?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাঁর পথে চলতে-চলতে নিজের অজান্তেই তাঁর প্রতি নির্ভরতা এসে পড়ে। যে মুহূর্তে নির্ভরতা এল সেই মুহূর্তেই তার দয়া লাভ করা যায়। তাহলে শোন্‌ বলি—

দাক্ষিণাত্য ভ্রমণকালে একদিন গভীর অরণ্যপথ ধ’রে শ্রীমন্‌ মহাপ্রভু চলেছেন। পথে যেতে-যেতে ভাবাবেগে এক বৃক্ষতলে দণ্ডায়মান হলেন। সেবক গোবিন্দ দাস পাশেই দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই অরণ্যপথ ধরে বিরাট একটা বাঘ সোজা তাদের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে গোবিন্দ দাস ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন! ভাবলেন—শেষকালে বাঘের হাতেই বুঝি প্রাণ যাবে! ভয়ে কিংকর্তব্য-বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। কয়েক মুহূর্ত পরেই মনে হল—প্রভুর চরণপ্রান্তেই তো আছি। তিনি যা’ করেন তাই হো’ক—তাতেই মঙ্গল। গোবিন্দ দাস ব্যাকুল হয়ে প্রভুর চিরসুন্দর শ্রীমুখ দর্শন করতে-করতে নামে তন্ময় হয়ে পড়লেন। বাঘটা তখন প্রভুর কাছে এসে তাঁর পাদপদ্মে মাথা ঘষে শ্রীঅঙ্গের ঘ্রাণ নিতে লাগল। কিছুক্ষণ এভাবে কাটিয়ে আদর ও আনুগত্য জানিয়ে গোবিন্দ দাসকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ না ক’রে ধীরে-ধীরে গভীর অরণ্য প্রবেশ করল।

শ্রীশ্রীঠাকুরের পরমভক্ত জ্যোতিষ ঘোষ সম্বন্ধেও এরকম একটা ঘটনা আমার জানা আছে। উপস্থিত সবাই উৎসুক হ’য়ে জিজ্ঞাসা করল—আজ্ঞে, কী সেই ঘটনা?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—অনেক আগে, আজ থেকে ৫০/৬০ বছর হবে আমাদের দেশে অসম্ভব জঙ্গল ছিল। জঙ্গলে হরিণ, বড়-বড় লেপার্ড (গুলবাঘ), বড়-বড় শুয়োর প্রভৃতি বন্য জন্তু থাকত। তখন বছরে এক-আধবার আমাদের গ্রামে পোষা শুয়োরের পাল নিয়ে শুয়োরপালকরা আসত। এক-এক দলে একশ’-দু’শটা পর্যন্ত। তাদের মধ্যে পাঁচ-সাতটা খুব বড়-বড় শুয়োর থাকত, যারা বন্য বড়-বড় শুয়োর ও বাঘের সঙ্গেও “ফাইট্‌” দিত—দলের অন্যদের জীবন রক্ষার জন্য।

এই পোষা শুয়োরগুলো সমস্ত দিন জঙ্গলে-জঙ্গলে কচু, নানা জাতের উদ্ভিদ, কেঁচো, পোকামাকড় খেয়ে সন্ধ্যা হলেই সবাই কোন একটা ফাঁকা জায়গায় গোল বৃত্ত গঠন করে রাত কাটাত, যদিও তার আশেপাশেই জঙ্গল থাকতই। যে ঘটনাটা বলছি—তখন আমাদের বাড়ি থেকে কিশোরীমোহন দাসের বাড়ি যেতে একটা শ্মশান পড়ত। শ্মশানের বেশ খানিকটা আগে ও-রকম একটা শুয়োরের বৃত্ত ছিল। রাখালরা খানিকটা দূরে সাময়িক ব্যবহারোপযোগী ছোট্ট একটা চটের কুঁড়েঘর তৈরি করে খেয়েদেয়ে রাত কাটাত। সেইসময় একদিন শ্রীশ্রীঠাকুর কিশোরীমোহন দাসের বাড়ির দিকে আসছেন। রাত ৯টা-১০টা হবে—সঙ্গে হাতে লণ্ঠন নিয়ে জ্যোতিষ ঘোষ। শ্রীশ্রীঠাকুর ঐ শুয়োরগুলোর কাছাকাছি আসতেই দেখলেন একটা বেশ বড় গুলবাঘ একটু দূরে ওৎ পেতে বসে আছে, যেন কারো অপেক্ষায় আছে!

ঘটনা শুনে উপস্থিত সকলের চোখমুখে বিস্ময়ের ভাব। সকলে একমনে শ্রীশ্রীপিতৃদেবের কথা শুনে চলেছে।

তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন—জানিস্‌, শুয়োরেরা দিনরাত নোংরা ঘাটে, নোংরা খায়। কিন্তু যেখানে থাকে, রাত্রিবাস করে, ততটুকু জায়গার মধ্যে নোংরা করে না। পেচ্ছাব-পায়খানা পেলে বৃত্তের বাইরে এসে কাজ শেষ ক’রে সঙ্গে-সঙ্গে বৃত্তের মধ্যে ফিরে যায়। ঠাকুর জ্যোতিষ ঘোষকে বললেন, ‘ঐ দ্যাখ্‌ বাঘটা কেমন ওৎ পেতে আছে। কোন একটা শুয়োর বাইরে এলেই তাকে ধ’রে নিয়ে যাবে। এ-জাতীয় গুলবাঘ যেমন হিংস্র, তেমনি ধূর্ত! জ্যোতিষ, তুই এক কাজ কর। লন্ঠনটা নীচে রাখ্‌ আর বাঘের মত হামা দে। আস্তে-আস্তে বাঘের মত হাত পা ফেলে ফ্যাঁস্-ফ্যাঁস্‌ করতে-করতে বাঘের দিকে এগিয়ে যা’। আদেশমাত্র হাসিমুখে জ্যোতিষ সে-রকমভাবে ফ্যাঁস্-ফ্যাঁস্‌ করে তার কাছে গেলে বাঘ আরেক জায়গায় লাফ দিয়ে বসল। এভাবে তিন-চার লাফ দেওয়ার পর বাঘটা দৌড়ে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করল। তা’ দেখে ঠাকুর জ্যোতিষকে ডাকলেন—’আয় হয়েছে, শালা তোর ভয়ে বাঘটা কেমন পালিয়ে গেল !’

জ্যোতিষ ঘোষ অকপট—তাই নির্ভীক, নিশ্চিত্ত। চিরশান্ত। পরমদয়াল শ্রীশ্রীঠাকুরই যে তাঁর জীবনসর্বস্ব।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৩০/১১/৭৫ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা নং ২৭, ২৮, ২৯]