সাধু মানে … প্রেমী। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সাধু মানে যাদুকর নয়কো, বরং ত্যাগী, প্রেমী।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আজ আলোচনা করছে ছেলেরা। শ্রীশ্রীপিতৃদেব বোধিব্যাসকে আলোচনা করার আদেশ দিলেন।

বোধিব্যাস—অনেকে অনেক সময় সাধু লোকদের খারাপ ভাবে। মনে করে যাদুকর, কেউ বা মনে করে এরা ভণ্ড। কিন্তু তা’ নয়। সাধু মানে যাদুকর নয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ভণ্ড ভেবে লাভ কী? ঠাকুর যা বলেছেন তাই বল।

বোধিব্যাস কিছু বলছে না দেখে তিনি পুনরায় প্রশ্ন করলেন—ঠাকুর যে উপদেশ দিচ্ছেন তার দ্বারা আমরা কী বুঝতে পারছি?

বিষ্ণু—যাদুকর অনেক সময় অলৌকিক ঘটনা দেখায়, কিন্তু সাধু তা দেখায় না। সাধু সব কিছু ত্যাগ করে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—ত্যাগ ক’রে কী হয়েছে? বড় সাধু বলতে আমরা কী বুঝি?

সুখেন—যাদুকর মানে যারা যাদু দেখায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এটা বলছেন কেন ঠাকুর?

—আমরা সাধুদের নানারকম ভাবি, ভণ্ড ভাবি।

—যারা ভণ্ড ভাবে, তারা ভাবে। আমরা তা ভাবব কেন? ভণ্ড ভাবতে যাব কিজন্য?

একই প্রশ্ন তিনি নবানীকে করলেন।

নবানী—সাধুরা অনেক সময় অনেককে ওষুধ দেন। তাতে বড় বড় রোগ সহজে সেরে যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ। হয়তো দীর্ঘদিনের অসুখ। কিছুতে সারছে না। সাধু দেখে অসুখের কথা নিবেদন করলাম। তাঁর দেওয়া ওষুধ ভক্তিসহকারে ব্যবহার করে আমার অসুখ সেরে গেল। আবার অন্যরকম ঘটনাও চোখে পড়ে। হয়তো, জটা থেকে গঙ্গাজল বের করল । ভস্ম থেকে চাল বের করে দেখাল বলল, এটা রেখে দিলে বাড়ীতে আর কোনদিন চালের অভাব হবে না। এরকম অনেক ক্রিয়াকলাপ দেখা যায়। এসব কাজ যাদুকরের কাজ, ম্যাজিসিয়ানের কাজ।

যাঁরা প্রকৃত সাধু তাঁরা ওরূপ করেন না। তারা কী করেন? কোন দুঃস্থ যদি ভক্তিসহ প্রেমসহ তাঁর নিকট এসে নিবেদন করে তখন তিনি বলেন, এটা খাও, কিংবা ওমুক খাও—সেরে যাবে। তাঁরা কিসের থেকে করেন? ভালবাসা থেকে। যে বলছে তার ব্যথায় ব্যথী হয়ে বলেন। এঁরাই প্রকৃত ত্যাগী। ত্যাগী হলেন কী ক’রে?—ইষ্টকে ভালবেসে। ইষ্টকে এত বেশী ভালবাসেন যে তাঁর মত ভালবাসার পাত্র তার কাছে আর নেই। ইষ্টকে এমন ভালবাসেন যে জগতের আর সমস্ত বিষয় তাঁর নিকট নগণ্য। পরমপিতার নাম ছাড়া, পরমপিতা ছাড়া তাঁকে (ত্যাগী বা সাধু পুরুষকে) কোন কিছুই মুগ্ধ করতে পারে না। সবই তো তিনি—সবই পরমপিতার সৃষ্টি। তাই দুঃখী, পীড়িত মানুষ যখন ব্যাকুলভাবে তাঁর (ঐ সাধুর) কাছে আসে তখন তিনি আর স্থির থাকতে পারেন না—মানুষের দুঃখ দূর করার জন্য তিনি থাকেন সদা সচেষ্ট। আসলে, এরাই জগতের পরম বস্তু লাভ করেছেন। তাঁদের নিকট এর চেয়ে পরম বস্তু পাওয়ার আর কিছু নেই। তাঁরাই প্রকৃত প্রেমী। ব্যাপারটা বোঝা গেল তো?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—প্রেমী কিজন্য? পরমপিতাকে খুব ভালবাসেন—মনে-প্রাণে। ত্যাগী কিজন্য? পরমপিতাকে ভালবাসার জন্য আর কোন কিছুই তাঁদেরকে charm (মুগ্ধ) করতে পারে না। পরমপিতা এবং তঁৎসম্পর্কিত বিষয় ছাড়া সবকিছুই তাঁরা ত্যাগ করেন। আবার তাঁরা ভাবেন,—সবই পরমপিতার, সবাই তাঁর জীব, সবার মধ্যে তিনি আছেন। এই ভাব নিয়ে সকলের মঙ্গলের জন্য চেষ্টা করেন, সবাইকে ভালবাসেন। সকলের জন্য করেন, কিন্তু লক্ষ্য সেই এক—পরমপিতা। ঐ যে ঠাকুর বলেছেন—

“You are for the Lord
Not for others
you are for the Lord
And so for others.”

—এটাই তাঁর পরিচয়।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-৬/৬/৭৭ ইং]

প্রদীপ পাল নির্দেশ পেয়ে আলোচনা করে। বলে—সাধু দেখে অনেকেই বলে—যাদু জানে। মনে করে সাধু জলপড়া দিতে পারে, চাল টিপে ছাই করে দিতে পারে, ফুঁ দিয়ে ভাল করতে পারে। কিন্তু সাধু তা নয়। তারা ত্যাগী, প্রেমী। সব কিছু ত্যাগ করেছে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সব কিছু ত্যাগ করেছে মানে—ইষ্টের জন্যে সব কিছু ত্যাগ করেছে। সে তার নিজের জন্যে কিছু করে না। যার ইষ্টের প্রতি খুব ভক্তি সেই প্রেমী। ইষ্টের প্রতি, পরমপিতার প্রতি যদি খুব টান হয়—তখন খাওয়া-দাওয়া, ঘুম-টুম সব চলে যায়। তারা বেশী সময় লোকালয়ে থাকে না।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/তাং-২৩/৯/৭৯ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৫৬ – ১৫৭]