সাধনা নিয়ে অনুশ্রুতি ১ম খন্ড (৫১-৯৩)

অনুশ্রুতির ১ম খন্ডে “সাধনা” শিরোনামে পৃষ্ঠা ২৯৯ – ৩১৬ পর্যন্ত মোট ৯৩ টি বাণী রয়েছে। নিচে ৫১ – ৯৩ নং বাণীসমূহ দেয়া হলো।

চলনহারা চরণ-পূজা
        বন্ধ্যা পূজা সেই জানিস, 
আদর্শতে অটুট চলন
      বর্দ্ধনা তোর তাই মানিস্। ৫১।
করার নেশায় অন্তরায়ে
যতই ক’রে অতিক্রম
অভীষ্টে হয় উপনীত—
সুখ তা'রই হয় যে-জন ক্ষম । ৫২।
কারণ-পথে করণ আসে
        কারণেরই করণ-ধাঁজ,
করণ-পথের একটু আগেই
        অধিষ্ঠিত কারণ রাজ । ৫৩।
তপের তোড়ে বৃত্তিগুলি
কারণে হ'লে সমাহিত,
লাখ চাহিদার অযুত টান
নির্ব্বাণে হয় নির্ব্বাপিত । ৫৪ ।
ভালবাসা যা'র অটুট টানে
চলে প্রেষ্ঠঝোঁকে,
আত্মসমর্পণ হয় তাহারই
বৃত্তিভেদী রোখে। ৫৫।
দরদ-ভরা ইষ্টে টান
তবেই সিদ্ধ জপ আর ধ্যান। ৫৬।
ইষ্টে চেতন ব্যক্তিত্বটা
মন্ত্রে চেতন মন,
ইষ্টভৃতে দীক্ষা চেতন
সেবায় চেতন ধন । ৫৭।
ইচ্ছাশক্তি করতে প্রবল
থাকেই যদি তোর মতি—
রোজই করিস্ ভাল যা' তাই
বাড়িয়ে তুলিস্ তা'র গতি। ৫৮।
প্রেষ্ঠ প্রীতি-অনুরাগে
প্রেষ্ঠ-কথা বলা,
প্রেষ্ঠপ্রীতির নিছক টানে
প্রেষ্ঠ-পথে চলা,
প্রেষ্ঠ কিংবা প্রেষ্ঠ-কথায়
অভিরুচি যা'র,
যজন-যাজন হয়ই সহজ
জীবনমাঝে তা'র। ৫৯।
যেথায় থাকিস্ হ'স্ না বেহুস
করতে সন্ধ্যা-প্রার্থনা,
হ'বিই তা'তে কৰ্ম্মনিপুণ
শক্তি পাবে বর্দ্ধনা। ৬০।
পূর্ব্বঋষি উড়িয়ে দিয়ে
          অভিজ্ঞতা খুঁজিস্ পাগল?
দর্শন জ্ঞান যা'কিছু তা'র
          পূর্ব্বতনেই ভিত্তি অটল,
তা'কেই বেকুব করলি বাতিল
          বৃত্তিস্বার্থ-পূরণ তরে,
হাওয়ার ঘড়ায় কখনও কি
          যায় রে রাখা সলিল  ভ’রে ? ৬১।
ব্যস্ত হ'য়ে বৃত্তিরিপু 
দমন করতে যতই যাবি,
ঐ বিব্রতির সুযোগ নিয়ে
তা'রাই তোরে করবে দাবী;
শোন্ রে বলি আমার কথা—
রেহাই পাবি এড়িয়ে পাক,
মন না দিয়ে ধাঁধায় ওদের
অন্য কাজে ব্যস্ত থাক্। ৬২।
সাধনারই তপ-তাপেতে
বিনিয়ে-গুছিয়ে বৃত্তিগুলি
একীকরণে ইষ্টার্থেতে
সব যা'-কিছু গেঁথে তুলি',
সাশ্রয়ী সংহত হ'য়ে
দীপ্ত আলোয় আঁধিয়ার
প্রাণের টানের অমোঘ তাড়ায়
ক'রেই ফেলে চূর্ণীকার,
সিদ্ধ মানুষ পুরণকারী
তাঁ'কেই জানিস্ নিছক সবে,
ইষ্টানুগ জয়ের গানে
থাকেই সিক্ত সে-জন ভবে । ৬৩।
বাঁচা-বাড়ার সদাচারে
ইষ্টানুগ সংহতি,
এ ধাঁচে নয় চরিত্র যা'র
শুভে স্বতঃই বিরতি । ৬৪।
মন যা'তে তোর লেগেই থাকে
মুগ্ধ হ'য়েই রয়,
তা'রই প্রীতির চলন-বলন
প্রাপ্তি তা'কেই কয়। ৬৫।
দক্ষতাকে দখল  ক’রে 
প্রেষ্ঠমত্ততায়—
ক্রমাগত সৎচলনে
ভগবত্তা পায় । ৬৬ ।
ঈশ্বর তোরে বাসেন ভাল
স্বার্থ তা'তে কী ?
তুই ভাল না বাসলে তাঁ'রে
সবই ছাইয়ে ঘি। ৬৭।
'যদি' 'যেন' যতই দিবি
প্রার্থনা আর কর্ম্মস্থলে,
সাধ্য আবেগ সাঁতার দিয়ে
চলবে প্রায়ই ভাঁটি-জলে । ৬৮।
স্নায়ুগুচ্ছ স্থৈর্য্যঘাতী
উগ্রবীর্য্য ভোজন-পানে,
মন্দিরেতে যাসনে রে তুই
কী হবে তোর ভজন-ধ্যানে । ৬৯।
যজ্ঞ মানে বুঝলি কি তুই ?
আদর-সেবায়-যত্নে পালা
আর্য্য ছেলের নিত্য নীতি—
পঞ্চযজ্ঞে জীবন ঢালা,
ব্রহ্মযজ্ঞ দেবযজ্ঞ
নৃযজ্ঞ আর পিতৃযজ্ঞ,
ভূতযজ্ঞে পরিস্থিতির
সেবাবন্ধন করে প্রজ্ঞ । ৭০।
বৃত্তি যখন যেমনি  ক’রে
চিত্তটাতে ফলিয়ে রং
কর্ম্মে করে নিয়োজিত
ধ'রে নানান কুটিল ঢং,
সেইটি দেখে খুঁজে-পেতে
বিনিয়ে চিৎত্বে ক’রে গমন
অনুতাপে দগ্ধে' আবার
প্রায়শ্চিত্তই করে শোধন । ৭১।
সিদ্ধি ছাড়া মন্ত্র দান 
মরে মারে যজমান। ৭২।
পুরুষোত্তম-আদেশ-বিধি
অভিষিক্ত করে যা'কে,
যেমনই সে হোক্ না জন—
মন্ত্রশক্তি হয় চেতন,
যখনই সে দীক্ষাদানে
ইষ্ট-যাজন ডাকে,
বিসদৃশ বৃত্তিচাপে
নিদেশ-বিধির অপলাপে,
দুর্নীতিবশ হ'য়ে যখন
ইষ্টার্থটি করে হেলন,
উৎচেতনী শক্তিটি ওই
ছাড়েই জানিস্ তা'কে। ৭৩।
সিদ্ধব্যবহারী দ্রব্য-সহ 
অনুজ্ঞা যদি থাকে,
কিংবা তাঁ'দের আদেশ-লিপি
অভিষিক্ত করে যা'কে,
যেমনই সে হোক্ না জন
মন্ত্রশক্তি হয় চেতন
যখনই সে দীক্ষা দানে
ইষ্ট-যাজন ডাকে। ৭৪।
হ'লেও অজ্ঞান অবোধ জন
মন্ত্র-তাবিজ করলে ধারণ
সেই নিয়মে চললে যেমন
অনেক ব্যাধিই সারে,
ইষ্টদ্রব্যবাহী যা'রা
ইষ্টপথে চললে তা'রা
সেই চলনে শক্তি তা'দের
উছল ধারে বাড়ে। ৭৫।
লেলিহানী দীপনবেগে 
চক্ষু ক’রে তীক্ষ্ণতর
আন্ ধ'রে আন্ বিধির বিধান
অবশ প্রাণটি কররে খর,
দগ্ধিয়ে মার রক্তনেশার
প্রাণঘাতী যা' অবশতা,
কর্ রে নিপাত নিপাতীবাদ
নিপাত ক’রে দুর্ব্বলতা । ৭৬।
বহ্নি-ফাগের ধমক দেখি,
হপকে যাবি তুই,
এমনি কেন ভাবিস্ বেকুব
পড়বি ওতে নুই'। ৭৭।
আদর-ভরা ফুল্ল বাণী
আশার পিনাক হাতে,
প্রাপ্তিটাকে আনবি ডেকে
তপের আলোকপাতে। ৭৮।
দ্বন্দ্ব-বাধা-বিঘ্ন দলি'
দক্ষ-কুশল তড়িৎ রাগে,
গুরুর আদেশ পালন যেথা
সেথায়ই তো সিদ্ধি জাগে। ৭৯।
অসীম জানিস্ সসীম হ'য়ে
সীমায় করে বাস,
সসীমেতে দেখলে অসীম
তবেই কাটে ফাঁস । ৮০।
পাওয়ার মত যদি কিছু তা'
অমর জাতিস্মর,
মরণভেদী জীবন ধ'রে
সজাগ নিরন্তর । ৮১।
প্রশ্ন যেথায় মুগ্ধ হ'য়ে 
বুদ্ধ হ'তে চায়,
ঐ তো সেথায় পুরুষ-প্রবীণ
নবীন চোখে চায় । ৮২।
সাধন-পথে তপের তোড়ে
বৃত্তিগুলি যা'র
বিনিয়ে-বিনিয়ে গুচ্ছ ধ'রে
ইষ্টে সমাহার,
সাধন-সিদ্ধ তা'রেই জানিস,
কর্ম্মবীর সেই তো বুঝিস্,
টানের তোড়ে সাধার বলে
সিদ্ধি আসে তা'র । ৮৩।
প্রবৃত্তি যা'র সহজ চলায়
ইষ্টে স্বার্থান্বিত,
নিত্যসিদ্ধ তা'কেই জানিস্
সবারই প্রার্থিত । ৮৪।
ইষ্টটানে সেবার পানে
যা'র প্রকৃতি বয়,
সেবার পথে বৃত্তিগুলি
ইষ্টস্বার্থী হয়,
সেবায় মুখর সেই মহাজন
কর্মমুখর দীপন মনন,
করার পথে সিদ্ধি পেয়ে
কৃপা-সিদ্ধ হয় । ৮৫।
প্রেষ্টপ্রীতি ক্ষুণ্ণ করে
এমন বৃত্তি-হাতছানিতে
ধায় নাকো মন নিথর চলন
লোভপ্রদ লোভানিতে,
বৃত্তি কাবু বুঝবি তখন
বিনিয়ে হ'চ্ছে নবীন গঠন
পূরণ-গড়ন-প্রস্রবণে
প্রজ্ঞাদীপ্ত নাচনীতে । ৮৬।
জীবন-মরণ দুন্দুভিতে 
বাজলে রে ওই বিজয়-ডাক,
লাফ দিয়ে তুই পড়্ এখনো
কর্ম্মে বাজা সিদ্ধি-ঢাক । ৮৭।
অমৃতেরই অভিযানে
হতই যদি হ'স,
স্বর্গ যে তোর থাকবে অটুট
জয়ে কীর্ত্তিঘোষ । ৮৮।
প্রশ্ন আমার অস্তে যাউক
রহুক যুক্তি স'রে,
তোমার ব্রত করব পালন
মরণ স্তব্ধ ক’রে। ৮৯ ।
এক নিয়মে একটি কারণ 
রূপের উপর রূপটি ফুঁড়ে,
অবস্থানের সৃষ্টি ক’রে
হরেক রূপে চলছে উড়ে;
এক নিয়মের নানান্ ফেরে
কতই রূপের পরিস্থিতি,
যাচ্ছে অঢেল অবাধ ব'য়ে
এমনি চলাই তা'র প্রকৃতি;
ফুটছে রূপে চলছে রূপে
রূপেই আবার যাচ্ছে ডুবে,
ফোটা-ডোবার আবহাওয়াতে
অসীম বেগে চুপে-চুপে। ৯০।
অসীম যখন সহজ জ্ঞানে
সীমাতে ল'ন স্থান,
বৃত্তিভেদী টান হ'লে তাঁ'য়
দেখবি ভগবান। ৯১।
ঈশ্বরেরই ডাক এসেছে
তাঁ'র কাজে তোর সঙ্গতি,
যোগান দিয়ে ধন্য হ' তুই
হোক দলিত দুৰ্ম্মতি। ৯২।
কিসের দুঃখ দৈন্য কিসের
বিষাদ বা কী, কী অবসাদ,
ইষ্টীপুত প্রাণে গা' না
অমর রহুক আর্য্যবাদ;
পূর্ব্বতনে শ্রদ্ধা-আলোয়
পরবর্ত্তী চিনে লও,
যজন-যাজন-ইষ্টভৃতি
ধ'রে তোমার জীবন বও;
সসম্মানে বর্ণাশ্রমে
বহন কর যথারীতি,
অনুলোমী উদ্বহনে
যত্নে পালিস্ যথানীতি;
ইষ্টমুখী সেবায় করিস্
পাড়াপড়শীর উন্নয়ন,
নিতে হ'লেই করবি রে তা'র
যেটুক পারিস্ সম্পূরণ;
সদাচার করলে পালন
বাঁচা-বাড়ায় অমোঘ হয়,
প্রতিলোমে কু-এর জনম
রাষ্ট্র-সমাজ-জাতি ক্ষয়;
দশবিধ সংস্কারই
মনে রাখিস্ সত্য সার,
মরণভেদী অমর হাওয়া
আর্য্যনীতির শিষ্টাচার । ৯৩ ।