প্রেমের মত আকর্ষণকারীই …ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

প্রেমের মত আকর্ষণকারীই বা আর কে?

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

আদেশক্রমে ধৃতিবল্লভ আলোচনা শুরু করল।

ধৃতিবল্লভ—ভক্তির গাঢ়ত্বই প্রেম। আকর্ষণ মানে টান। যে কোন কিছু টানে, তাকে আকর্ষণকারী বলে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাহলে বাণী থেকে কী বোঝা যাচ্ছে?

ধৃতিবল্লভ—ঠাকুর সবাইকে ভালবাসেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তাতে তোমার কী? ঠাকুর তো সবাইকে ভালবাসেনই। এখানে বাণীতে কী বলা হচ্ছে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব প্রদীপকে আদেশ দিলেন বাণীটি ব্যাখ্যার জন্য।

প্রদীপ—যার প্রেম আছে সে-ই আকর্ষণ করে।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সে তো বুঝেছি। ‘বা আর কে’—একথার মানে কী?

কৃষ্ণানন্দ—প্রেমের মত আকর্ষণকারী আর কেউ নেই।

—তার মানে কী?

—ভক্তি যখন গাঢ় হয় তখন প্রেম হয়।

—এটা দুধ না-কি যে গাঢ় হবে!

—ঠাকুরকে আমরা ভক্তি করি। ভক্তি করতে করতে যখন খুব গাঢ় হবে . . .।

—সেটা কী ক’রে বুঝব?

কারো উত্তর বেশ পরিষ্কার হচ্ছে না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ঠাকুরের প্রতি ভক্তি করতে-করতে এক সময় মনে হবে, সবই ঠাকুরের। তারপর এক সময় মনে হবে, ঠাকুরই সব। তিনিই সবার মধ্যে বিরাজমান। জীবজন্তু, গাছপালা সবার মধ্যে তিনি। এরকম যখন মনে হয় তখন কি আর তাকে কেউ টানতে পারে? তখন আর অন্য কিছু টেনে রাখতে পারে না। সব বাঁধন আলগা হয়ে যায়। এটা কেমন ক’রে হয়? আসলে ভালবাসাই পেতে চাই আমরা সকলে। তাঁর চেয়ে বেশি ভালবাসার আর কেউ থাকে না, আর তাই তার চেয়ে বেশি আকর্ষণকারী আর কে-ই বা থাকতে পারে। এটা আমরা বোধ করতে পারি যখন আমরা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হই—তাঁকে সর্বসত্তা দিয়ে ভালবাসি। তখনই আমরা তাঁকে বুঝতে পারি, তাঁর ভালবাসার স্বাদ পাই। তখন বাঘ, ভালুক—হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের মধ্যেও তাঁর প্রেম খুঁজে পাই। তারাও তাই হিংসা ভুলে যায়—একান্ত আপনজনের মতই আদর করে, সোহাগ করে। এসবের গোড়ার কথা হ’ল ইষ্টকে ভালবাসা, মন-প্রাণ দিয়ে সর্বান্তকরণে তাঁকে ভালবাসা—তাঁকে আপন ক’রে নেওয়া। প্রেম জাগে কিভাবে? ইষ্টকে ভালবাসার ফলেই। সমগ্র সত্তা দিয়ে তাঁকে ভালবাসলেই।

ভালবাসার প্রথম স্টেজে মনে হবে, সবই ঠাকুরের। রাজা, মহারাজা, মন্ত্রী—সব ঠাকুরের। বিশ্বদুনিয়ায় যা-কিছু আছে সবই তাঁর। তারপর এই ভাব পেকে যায় যখন, তখন মনে হয় ঠাকুরই সব হ’য়ে আছেন। তখন ঠাকুরকে ভালবাসি ব’লে তাঁর দুনিয়াকেও ভালবাসি। রাম, শ্যাম, যদু, পশুপক্ষী, গাছপালা—সবাইকে ভালবাসি। অযথা কারো সাথে খোঁচাখুচি হয় না। সে রকম প্রবৃত্তিই আসে না। প্রেমময়কে ভালবাসার ফলে মানুষ প্রেমের অধিকারী হয়। ঐ এক প্রেমের টানে আর সব তুচ্ছ মনে হয়—জাগতিক সব বন্ধন আলগা হয়ে পড়ে। তাই ঠাকুর বলেছেন, প্রেমের মত আকর্ষণকারীই বা আর কে! অর্থাৎ প্রেমের মত আকর্ষণকারী আর কিছু নেই।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১৬/১০/৭৭ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ২৪২]