বন্ধুর কুৎসা … দিও না।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

বন্ধুর কুৎসা রটিও না বা কোনও প্রকারে অন্যের কাছে নিন্দা ক’রো না; কিন্তু তাই ব’লে তার নিকট তার কোন মন্দের প্রশ্রয় দিও না।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের মুখোমুখি বসেছে মৃত্যুঞ্জয় (রায়), বয়স ১২-১৩-এর বেশী নয়।শ্রীশ্রীপিতৃদেব তাকে আলোচনা করতে নির্দেশ দিলেন।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তুমি কী কর?

মৃত্যুঞ্জয়—ইষ্টের কাজ করি।

—পড়াশুনা কর না?

—আজ্ঞে, করি।

—তাহলে বল, আমি ছাত্র । লেখাপড়া শেখ কিজন্য?

—সৎকাজ করার জন্য, মানুষ হবার জন্য ।

—মানুষ হবার জন্য তো! কি করে মানুষ হবে? লেখাপড়ার সঙ্গে মানুষ হবার কী সম্পর্ক আছে?

মৃত্যুঞ্জয়কে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ভাল ক’রে লেখাপড়া শিখলে ইষ্টের কাজ করার সুবিধা হয়, ঠাকুরের বই-টই পড়তে পারা যায়। এখন বাণীটা আলোচনা কর।

মৃত্যুঞ্জয়—আমি পাশ করলাম, আমার বন্ধু পাশ করতে পারেনি, promotion পেল না, আমি সবার কাছে ব’লে বেড়চ্ছি—আমার বন্ধু পাশ করতে পারেনি।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—পাশ করতে পারেনি যখন বলছি তখন পাশ করতে না পারার কোন কারণ থাকতে পারে। হয়ত জ্বর হয়েছিল, পড়াশুনা করতে পারেনি, পাশ করতে পারল না—এটা তো আর নিন্দা হ’ল না।

মৃত্যুঞ্জয়—আমি ব’লে বেড়াচ্ছি, পাশ করেনি, আড্ডা মেরে বেড়ায়—এটা নিন্দা; বন্ধুর নিন্দা করব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু তাই ব’লে তার নিকট তার মন্দের প্রশ্রয় দেব না—বুঝিয়ে বল।যখন পড়াশুনা না ক’রে আড্ডা মেরে বেড়ায় তখন তুমি বলবে—ভাই পড়াশুনা কর। এমনভাবে বলবে যাতে সে শোনে। বলবে—পড়ার সময় আমিও পড়ি, তুমিও পড়। তোমায় নিজেকেও পড়তে হবে। নিজে না পড়লে উপদেশ দিলে শুনবে কি? মা-বাবা অত বলেন তায় শোনে না! কিন্তু আমি বন্ধু, আমার কথা শুনতে পারে। বন্ধুদের সঙ্গেই তো সে আড্ডা দেবে, তাই পড়ার সময় তোমার কাছে গেলে তুমি বলবে এটা পড়ার টাইম, ক্লাসের পড়া রয়েছে। এমনভাবে বলতে হবে, এমনভাবে চলতে হবে যাতে সে তোমার কাছে আড্ডা বা বাজে কথার প্রশ্রয় না পায়। আর যদি লোকের কাছে ব’লে বেড়াও—পড়ে না, আড্ডা মেরে বেড়ায়, আমাদেরও পড়তে দেয় না, ফেল করে, তাহলে তার নিন্দা করা হয়। তুমি যদি তার নিন্দা না ক’রে পড়াশুনা করতে থাক তাহলে সেও তোমার দেখাদেখি পড়াশুনা শুরু করবে।

এবার শ্রীশ্রীপিতৃদেব সৎসঙ্গ প্রেসের কর্মী হৃষীকেশ দে-র(১৬।১৭) দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন—তুমি তো পড়াশুনা কর না?

হৃষীকেশ—আজ্ঞে না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিন্তু তোমারও বন্ধু আছে, উপমা দিয়ে উদাহরণ দিয়ে বাণীটা বুঝিয়ে দাও।

হৃষীকেশ—আমার বন্ধু বিনা কারণে কাউকে মারল, তখন ওকে ডেকে নিয়ে বলব—কেন তুমি শুধু-শুধু মারলে?

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—এ তো গেল বিনা কারণে মারলে কী করবে! আর যদি কারণে মারে?

হৃষীকেশ—তখন কিছু বলব না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কেন, বলবে না কেন? বলবে—গায়ে হাত দিতে যাবে কেন? মুখে-মুখেই তো কথা হচ্ছে। ওর-ও (যে মেরেছে) অভিভাবক আছে, department-এর head (দপ্তরের প্রধান) আছে, section-এর head (বিভাগীয় প্রধান) আছে, তাদের বলে দিলে তারাই ব্যবস্থা নেবে। গায়ে হাত তোলা ভাল না। তা’ ভিন্ন সে-ও বলবে—দেখে নেব।

[ ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং-১/২/৭৬]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ ৮৯, ৯০]