যে বলায় কম কাজে বেশী,….।-ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

যে বলায় কম কাজে বেশী, সে-ই প্রথম শ্রেণীর কৰ্ম্মী ; যে যেমন ব’লে তেমনি করে, সে মধ্যম শ্রেণীর কৰ্ম্মী ; যে ব’লে বেশী, কাজে কম, সে তৃতীয় শ্রেণীর কৰ্ম্মী ; আর যার ব’লতেও আলস্য, ক’রতেও আলস্য, সেই অধম।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

এবার ছেলেদের মধ্যে বিজন (মণ্ডল), সুজিৎ (বসু) ও সুভাষ (মণ্ডল) এবং মেয়েদের মধ্যে স্বপ্না (চৌধুরী), ঋকু (দত্ত) ও ভাস্বতী (চ্যাটার্জী) পাঠ করল।

গতকাল ছেলেরা আলোচনা করেছে, আজ করবে মেয়েরা। শ্রীশ্রীপিতৃদেব স্বপ্নাকে আলোচনা করতে বললেন।

স্বপ্না—এই বাণীতে ঠাকুর কর্মীদের কথা বলছেন, কে কেমন কর্মী সে বিষয়ে বাণীতে বলা হয়েছে।

গোবর্ধনদা—একটা উদাহরণ হ’লে ভাল হয়।

স্বপ্না—কোন লোককে আমি একটা কাজ করতে বললাম। কাজ সম্বন্ধে সে মুখে যা’ বলল তার চেয়ে অনেক বেশী করল—সে-ই প্রথম শ্রেণীর কর্মী। আর যে মুখে যা’ বলল, কাজেও তেমনি করল, এর বেশীও না কমও না—সে দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মী। যে বলার বেলায় বেশী, কাজের বেলায় তার চেয়ে কম—সে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মী। আর যে বলতেও পারে না, করতেও জানে না—ঠাকুর তাকেই বলছেন অধম, নীচুস্তরের কর্মী।

স্বপ্নার আলোচনা শু’নে শ্রীশ্রীপিতৃদেব কৌতুক ক’রে বললেন—হ্যাঁ, একদল আছে, যারা কুইন্‌ ভিক্টোরিয়া কিংবা রানী এলিজাবেথের দলের—হুকুম করাই কাজ যাদের, আর একদল আছে যাদের কাজ ঐ হুকুম তামিল করা। ও (স্বপ্নাকে নির্দেশ ক’রে) হুকুম ক’রতেই expert (পারদর্শী), হুকুম তামিলে নয়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের কথায় সকলে হেসে উঠলেন। স্বপ্নার আলোচনার সূত্র ধ’রে গোবর্ধনদা বললেন—কি কাজ পরিষ্কার বোঝা গেল না।

স্বপ্নাকে নিরুত্তর দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার ঋকুকে আলোচনা করতে বললেন।

ঋকু—আমি হয়তো কোন একটা কাজ করলাম। কাজটা করলাম ঠিকই। কিন্তু যা করণীয় মুখে তার চেয়ে কম বললাম। তাহলে এটা প্রথম শ্রেণীর কর্মীর কাজ হবে। আর যা করলাম বলার সময় যদি তা-ই বলি তাহ’লে সেটা দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মীর কাজ হবে।

ঋকুর বলা শেষ হতেই শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কাজের একটা নাম আছে তো! না-কি আমি একটা কাজ করলাম, কিংবা করতে বললাম—বাবাকে, না কাকাকে, না মামাকে স্পষ্ট করে বললে বুঝা যায়। (একটু থেমে) কর্মী তো হতে হবে আমাকে। ঠাকুর বাণীটা দিয়েছেন কার জন্য? আমার জন্য তো! তাহলে কাজ করতে হবে কাকে?—আমাকে। কাজের নামটাও বলতে হবে পরিষ্কার ক’রে।

ভাস্বতী—আমাকে হয়তো মা পড়তে বললেন। পড়া তৈরী করলাম। যা করলাম, মুখে তার চেয়ে কম বললাম।—এটাই প্রথম শ্রেণীর কর্মীর কাজ।

ভাস্বতীর কথা শুনে জনৈক দাদা বললেন—যদি এমন পড়া তৈরী করি যে, প্রশ্নের সম্মুখীন হ’লেই চুপ ক’রে যাই তাহলে কি সেটাই হবে উৎকৃষ্ট শ্রেণীর কর্মীর লক্ষণ?

সকলের হাসির উদ্রেক করল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের সম্মুখে বসে আছেন ক্ষিতীশ মাষ্টারমশাই (সেনগুপ্ত)। দীর্ঘদিন ধরে তপোবন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে রয়েছেন। বয়স্কলোক। তিনি মেয়েদের উত্তরদানে সাহায্য করছিলেন শ্রীশ্রীপিতৃদেব ক্ষিতীশদাকে আলোচনা করতে বললেন।

ক্ষিতীশদা—মায়ের উদাহরণ দিয়েই বলা যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—হ্যাঁ-হ্যাঁ, বলুন।

ক্ষিতীশদা—সংসারে মা সন্তানের জন্য কত করেন, কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। তিনিই প্রথম শ্রেণীর কর্মী।

হেসে উত্তর দেন শ্রীশ্রীপিতৃদেব—মা প্রথম শ্রেণীর কর্মী। আর বাবা মা-র মত সন্তানের জন্য অত করেন না, তাহ’লে বাবা দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মী হবে—দাদা তো বাবার চেয়েও কম করে থাকেন সাধারণতঃ। আর দিদি হবেন অধম।

এবার উচ্চৈস্বরে সকলে হেসে উঠলেন।

ক্ষিতীশদা হাসতে হাসতে বললেন—আজ্ঞে, প্রথম শ্রেণীর কর্মী হিসাবে মা-র কথাই আমার মনে হয়। তাই বললাম। বাবা দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মী হবেন কি-না বলতে পারি না।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কেন, বলুন না! ঠিকমত একটা উদাহরণ দিয়ে বললেই হয়।

ক্ষিতীশদা এবার ইষ্টকর্মের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তবু বিষয়টা মোটেই পরিষ্কার হ’ল না দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—কর্ম বলতে কী বোঝায়? বহু কর্ম রয়েছে। একটা সহজ উদাহরণ দেওয়া যায় না, যাতে ঐ চারশ্রেণীর কর্মীকে বুঝানো যায়?

উপস্থিত সকলকে নির্বাক থাকতে দেখে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—ক্ষিতীশদা তো school teacher (বিদ্যালয়ের শিক্ষক), উনি ছেলেদের teach (শিক্ষা) দেন। ঐ teaching (শিক্ষাদান) নিয়েই উদাহরণ দেওয়া যায়। স্কুলে কোন-কোন শিক্ষক থাকেন যাদের স্বভাব-চরিত্র খুবই সুন্দর। ক্লাসে পড়ানও ভাল, কম বলেন, কিন্তু যা বলেন তাতেই ছেলেরা ঠিক ধ’রে ফেলে, ক্লাসেই পড়া মুখস্থ হয়ে যায়। আবার নিজেরাও স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলা ঠিক-ঠিক মেনে চলেন। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে লেকচার দিয়ে বেড়ান না—আমি ঠিক সময়ে স্কুলে আসি, প্রতিদিন ক্লাস নিই, ছেলেদের task (পড়ার কাজ) দিই, এসব মুখে বলেন না, কিন্তু কাজে ক’রে চলেন। এরকম শিক্ষক দেখা যায় না?

সকলেই একবাক্যে বলেন—আজ্ঞে হ্যাঁ, স্কুলে এরকম শিক্ষকও দেখতে পাওয়া যায়।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব পুনরায় বললেন—আবার কোন কোন শিক্ষক থাকেন যিনি কাজে ওরকমই করেন, প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্কুলে আসেন, নিয়মিত ক্লাসে যান, ছেলেদের task (পড়ার কাজ) দেন, আর মুখে ছাত্রদের মাঝে কি শিক্ষকদের মাঝে প্রায়ই ব’লেও বেড়ান এসব। এধরণের কর্মীকে ঠাকুর দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মী বলেছেন। আর যারা ক্লাসে গিয়ে বেশ লম্বা বক্তৃতা দিলেন, কিংবা গল্প করলেন—হয়তো কোন প্রসঙ্গ ছিল না, তবু এমনিই বেশ গল্প ক’রে সময় কাটালেন; ছেলেরা বুঝল কি বুঝল না, গল্পটা প্রাসঙ্গিক কি অপ্রাসঙ্গিক খেয়ালই নেই, এমনিভাবে সময় কাটিয়ে দিলেন—এরা হলেন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মী। আর অধম হলেন তারাই, যারা বাস্তবে ছেলেদের উপকার করেন না, বাক্যব্যয়ও করেন না; ক্লাসে গিয়ে হয়ত টেবিলের উপর মাথা রেখে ঝিমুতে থাকেন। ছেলেদের হয় একটা task দিলেন—কিন্তু ছেলেরা তা’ করল, কি করল না, বুঝেছে কি বোঝেনি খেয়াল নেই। এরাই হলেন, ঠাকুর যাদের বলেছেন অধম।

ইষ্টকাজের উদাহরণ দিয়েও বলা যায়। আমাদের মধ্যে যারা ঠাকুরের কর্মী আছেন তাদের কারও কারও মাসে-মাসে দীক্ষাও হয় প্রচুর, ঠাকুরের উৎসবের collection (অর্ঘ্য সংগ্রহ)-ও তারা করে—হয়তো কোটা থেকে অনেক বেশীই করে, কিন্তু মুখে এসব ব’লে বেড়ায় না। অন্যে হয়তো তাকে দেখে বুঝতেই পারে না যে সে এতশত ক’রে চলে। আবার একদল আছে যারা ঠাকুরের কাজ করে ঠিকই—দীক্ষা দেয়, সংগ্রহও করে, কিন্তু আবার সকলকে বলেও বেড়ায়—আমার দীক্ষা সংখ্যা এত, আমি উৎসবে এত-এত সংগ্রহ করি ইত্যাদি। আবার কিছু লোক আছে যারা কাজের বেলায় নাই, কিন্তু কথার বেলায় বেশ। হয়তো কোন জায়গায় গিয়ে একটা দীক্ষা দিল, কিন্তু ব’লে বেড়াল—আমি ঘুরে-ঘুরে সর্বত্র দীক্ষা দিচ্ছি, আমি ঠাকুরের জন্য এতশত করলাম! কোথাও হয়ত উৎসব হ’ল, সে ব’লে বেড়াতে লাগল উৎসবের জন্য এই-এই করলাম। ব’লে বেড়াচ্ছে এই-এই করলাম, কিন্তু খবর নিলে দেখা যাবে আসল কাজের বেলায় গোটাটাই ফাঁকি। আর কিছু কর্মী আছে যারা এদিকে হু ওদিকেও হু দিয়ে চলে। করেও না, আর বলেও বেড়ায় না।—এরাই অধম।

অতঃপর সকলের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ ক’রে বললেন—এরকম হয় না?

সকলেই আনন্দে সম্মতিসূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন।

অপর একটি উদাহরণ দিয়ে শ্রীশ্রীপিতৃদেব বললেন—উৎসবের সময় মনে করুন ২০।২৫ বা ১০০ জন Volunteer (স্বেচ্ছাসেবক) আছে। তাদের মধ্যে শ্রেণীবিভাগ কি করে করবেন? ওদের মধ্যেও দেখবেন, কেউ-কেউ ঠিক কাজ খুঁজে নিচ্ছে, যেখানে কোন অসুবিধা ঘটছে সেখানেই দৌড়ে যাচ্ছে। কারও ছেলে হারিয়ে গেছে —মাইকে announce (প্রচার) করছে, সবার সুবিধা করার দিকে নজর—ভিড়ের মধ্যেও যতখানি করা যায়। তার সেবা পেয়ে সবাই খুশি হচ্ছে। কিন্তু সে মুখে কিছু বলছে না—এই করলাম, সেই করলাম। সে-ই প্রথম শ্রেণীর। আবার একশ্রেণী রয়েছে যেমন বলছে তেমন করছে—এরা দ্বিতীয় শ্রেণীর। একদলের শুধু মুখে বলে বেড়ানোর অভ্যাস—লেকচারই দিয়ে যাচ্ছে, কাজে কিছু করছে না। এরা তৃতীয় শ্রেণীর। আর তারই পাশে একজন চেয়ারে বসে ঘুমোচ্ছে, কিছু বলছেও না, করছেও না।

এই উদাহরণেও বাণীটির অর্থ সকলের নিকট পরিষ্কার।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব এবার হাসতে হাসতে ক্ষিতীশদার উদ্দেশ্যে বললেন—আপনি তো একজন কর্মী। আপনি কয় নম্বরের?

শ্রীশ্রীপিতৃদেবের শ্রীমুখ থেকে এই বাক্য নির্গত হওয়ামাত্র হাস্যরস মাধুর্যে পরিমণ্ডল সিক্ত হয়ে উঠল।

[ইষ্ট-প্রসঙ্গে/তাং২৫/৬/৭৭ ইং]