সহিষ্ণুতা মানে … আলিঙ্গন। – ব্যাখ্যা

সত্যানুসরণ-এ থাকা শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণীটি হলো:

সহিষ্ণুতা মানে পলায়ন নয়কো, প্রেমের সহিত আলিঙ্গন।

পরমপূজ্যপাদ শ্রীশ্রীবড়দা কর্তৃক ব্যাখ্যা :

বাণীটি আলোচনার ভার পেল বিষ্ণুদ্যুতি সাহা। ও বাণীটি পুনরায় পাঠ করে বলল—সহিষ্ণুতা মানে সহ্য করা।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তার মানে কি? সহিষ্ণুতার সাথে সহ্যের কি সম্পর্ক আছে?

—কেউ কিছু বললেই সেটা আমি সহ্য করে নিলাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—কিছু বললেই কেউ সহ্য করে নাকি?

—কেউ হয়তো খারাপ কথা বলল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—সেটা বল্‌। হয়তো যা বলা উচিৎ নয়, তা বলল।

—সেটাকে আমি যদি সহ্য করে চলে এলাম, তাহলে পলায়ন হল।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—তবে কি বসেই রইলি?

—সেখানে থেকেই তাকে ভাল কথা বললাম।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—যদি ভাল কথা না শোনে? (তারপর নিজেই বলে দিলেন) কেউ কিছু খারাপ কথা বললে সহ্য করলি, পালালি না—দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলি, মিষ্টি কথা বললি। —আর প্রেমের সাথে আলিঙ্গন কি রকম? বক্সী বল্‌ (ধৃতিদীপি বক্সীকে)।

ধৃতিদীপি—আমার বন্ধু কেউ যদি অন্যায় করে তাকে আমি ত্যাগ করে চলে যাব না বরং তাকে বোঝানোর চেষ্টা করব, যাতে সে ভবিষ্যতে আর অন্যায় না করে। আমি যদি পালিয়ে যাই তাহলে সহ্য করা হল না। সহ্য করব, ভালবাসার চেষ্টা করব।

শ্রীশ্রীপিতৃদেব—আমাকে কেউ মন্দ কথা বলল, যা সহ্য করা উচিৎ নয়, তখন আমি কিছু মনে করলাম—কিন্তু সেই সাথে ভালবাসার চেষ্টা করলাম। সহ্য করার মধ্যে দুটো sense (ভাব) আছে। একপ্রকার সহ্য করার ভাব অনেকটা পলায়নকে mean করে (বোঝায়)। আবার আর একপ্রকার হতে পারে, যেমন —কেউ হয়তো এমন কথা (খারাপ কিছু) বলল —তা আমি সহ্য করলাম, কিন্তু পালিয়ে গেলাম না। যেমন, তোকে আমি শালা বললাম—“ঐ শালা বাঁদর যাচ্ছে, বাঁদর কাহাকা—পড়া নাই, শোনা নাই—ঘুরে বেড়াচ্ছে।” হয়তো তুই পড়িস। তখন বলতে হবে—আমাকে বলছেন? কেন বলছেন? কি করেছি? এমন বলছেন কেন?—এগুলো হচ্ছে প্রেমের সহিত আলিঙ্গন। আবার সহিষ্ণুতা হবে তখন, যখন তোকে নিজে শালা বললে কিছু হলো না, চুপ করে থাকলি, কিন্তু যখন শালার বেটা বলল অযথা বাপ তুলে, ঠাকুরদা তুলে কথা বলল, তখন বলতে হয়—এটা বলা ঠিক না। তাতে প্রেমের সহিত আলিঙ্গন হয়। একটু পর আবার বলছেন, সহিষ্ণুতা মানে পলায়ন নয়কো, কিন্তু পলায়নের রূপ নেয়। আমি এই রকম অবস্থায় দু-চারবার পড়েছি। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি—পিছন থেকে বলল—ঐ শালা যাচ্ছে। তাকায়ে দেখলাম—একজন ছাড়া আর কেউ নাই। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম—আমাকে বলছেন? তখন বলল—না, না, আপনাকে না। বললাম—বেশ ভাল। বলে চলে গেলাম। এই রকম কয়েকবারই হয়েছে।

[পিতৃদেবের চরণপ্রান্তে/২৫/৯/৭৯ ইং]

শ্রীশ্রীবড়দা—’পলায়ন’ মানে তো back করা। (সতীশদাকে) তাহ’লে কি বোঝা যাবে?

সতীশদা—একজন একটা অন্যায় কথা ব’লেছে, সে সহ্য ক’রতে পারল না।

শ্রীশ্রীবড়দা—ছোটবেলা থেকে শুনেছি—’যে সয় সে রয়’। আমি কিছু করি নাই, কিন্তু ননীদা অকারণে ধমক দিলেন। আমি কড়া ক’রে বা বুঝিয়ে বিনয়ের সঙ্গে একটা প্রতিবাদ করলাম। পরে আমি কিন্তু থাকলাম না, ভাবলাম থাকলে আবার যদি বিপদে প’ড়ে যাই। কিন্তু সহিষ্ণু মানুষ হ’লে থাকব, সময় মত বলব—ননীদা, আমি তো তখন ছিলাম না, আপনি শুনলেন কার কাছ থেকে? তখন ননীদা ব্যাপারটার মোকাবিলা করলেন, শেষে চুপ মেরে গেলেন। অপ্রেমী ভাব থেকে আবার ভালোবাসায় মিলিত হলেন আমার সাথে।

[‘যামিনীকান্ত রায়চৌধুরীর দিনলিপি/তাং-৪/৬/৭৬ ইং]

[প্রসঙ্গঃ সত্যানুসরণ পৃষ্ঠা ১৫৮]